ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

অস্ট্রেলিয়ার কথা বলে কাজাখস্তানে নিয়ে নির্যাতন, যেভাবে ফিরলেন সোহেল

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০৯:১৯ এএম

অস্ট্রেলিয়ার কথা বলে কাজাখস্তানে নিয়ে নির্যাতন, যেভাবে ফিরলেন সোহেল

অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে এক দশক আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেন সোহেল রানা। কাজ করতেন হোটেলের বাবুর্চি হিসেবে। পরে চাকরি ছেড়ে নিজেই দুটি রেস্তোরাঁ চালু করেন। ভালোই চলছিল ব্যবসা। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন পেয়ে বসে তাঁর। দেশে ফিরে আসেন। দালালের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপে আর যাওয়া হয়নি তাঁর। পরে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর কথা বলে তাঁকে নেওয়া হয় কাজাখস্তানের বন্দিশিবিরে। অবশেষে নিঃস্ব হয়ে পালিয়ে কোনোমতে দেশে ফিরেছেন তিনি।

সোহেল রানা ওরফে জুয়েলের (৩৮) বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামে। ১২ বছর ও ৬ মাস বয়সী দুই ছেলে ও স্ত্রী মুক্তা বেগমকে নিয়ে তাঁর সংসার। ১৬ লাখ টাকার চুক্তিতে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার জন্য দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে নিজের জমানো টাকা, সুদের পরিবর্তে ধান দেওয়ার চুক্তিতে নেওয়া টাকা, এনজিওর ঋণ ও ধারদেনা করে ১২ লাখ টাকা দিয়েছিলেন দালালকে। নিঃস্ব হয়ে ২০ এপ্রিল দেশে ফেরার পর দেনাদারদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

এ ঘটনায় গত ৯ মার্চ যশোরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ একটি মামলার আবেদন করেন সোহেলের স্ত্রী মুক্তা বেগম। আদালতের নির্দেশে ৬ এপ্রিল বাঘারপাড়া থানায় মামলা রেকর্ড হয়। মামলায় ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার মুসলিমনগর গ্রামের মো. কাইয়ুম (৪৮) ও তাঁর স্ত্রী নাজমা আক্তারকে (৪৫) আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

সম্প্রতি বাঘারপাড়ার ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামে সোহেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, ৪ শতাংশ জমির এক পাশে দুই কক্ষের একটি টিনের ঘর। সেমিপাকা ঘরের বারান্দার এক পাশে একটি ছোট কক্ষ। ঘরের সামনে ছোট একটি রান্নাঘর। টিন দিয়ে ছাওয়া রান্নাঘরের দুই পাশে পলিথিনের বস্তা সেলাই করে বেড়া দেওয়া। রান্নাঘরের অন্য পাশে কোনো বেড়া নেই।

কথায় কথায় সোহেল রানা জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি মালয়েশিয়ায় গিয়ে একটি হোটেলে বাবুর্চির কাজ নেন। এরপর সেখানে নিজের দুটি রেস্তোরাঁ গড়ে তোলেন। হোটেলের চাকরি ছেড়ে নিজের রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন। তার আগে ২০১৪ সালে দেশে থাকতে দালাল নাজমা আক্তার ওরফে নূরজাহানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলে দালাল তাঁকে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখান।

সোহেল রানার ভাষ্য, দালালের প্রলোভনে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু নাজমা তাঁকে ইউরোপে পাঠাতে পারেননি। পরে মাসিক হাজার ডলারের বেতনের চাকরি দেওয়ার শর্তে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চুক্তি হয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর আজ-কাল করে তাঁকে ঘুরাতে থাকেন নাজমা। পরে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি এক মাসের ব্যবসা ভিসায় তাঁকে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই নেওয়া হয়। সেখান থেকে পরদিন ১৬ জানুয়ারি তাঁকে নেওয়া হয় কাজাখস্তানে। সেখানে এক মাস থাকার পর তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

নির্যাতনের কথা তুলে ধরে সোহেল বলেন, কাজাখস্তানের হোটেলে থাকতেই শুরু হয় নির্যাতন। সেখানে আরও দুই বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনজনের থেকেই পাসপোর্ট কেড়ে নেন নাজমার প্রতিনিধি। এরপর ২৪ জানুয়ারি গাড়িতে করে তাঁদের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরে শিমক্যাট নামের একটি পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে লোহা গলানোর কারখানায় তাঁদের তিনজনকে আটকে রাখা হয়। এরপর দালালের প্রতিনিধি সেখান থেকে বের হতে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন। অন্যথায় প্রাণে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেন। তখন তাঁদের দিনে একবার একটি করে রুটি খেতে দিত।

সোহেল রানার ভাষ্য, বন্দিদশা থেকে পালাতে বাংলাদেশি অন্য দুজনের সঙ্গে তিনি শলাপরামর্শ করেন। একজন প্রহরীর সহায়তায় ২৮ জানুয়ারি পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সঙ্গী দুজনের একজন রাজি হননি। পরে অন্যজনকে সঙ্গে নিয়ে কারখানার সীমানাপ্রাচীর টপকে পালান তিনি। পরে একটি হোটেলে উঠে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তাঁরা বিপদের কথা জানান। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী সব শুনে সোহেলকে দেশে পাঠাতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। সোহেলের স্ত্রী ধারকর্জ করে আইনজীবীর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ও বিমানভাড়া বাবদ আরও ১ লাখ টাকা পাঠান। এরপর ট্রাভেল পারমিট নিয়ে ২০ এপ্রিল দেশে ফেরেন সোহেল।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে নাজমা আক্তারের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করেও বন্ধ পাওয়া যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাঘারপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মামলার আসামি মো. কাইয়ুম দেশের বাইরে আছেন। অপর আসামি নাজমা আক্তারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শেষ হয়ে গেছি। ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রায় ১৫ লাখ টাকার দেনা। দেনাদারেরা প্রতিদিন টাকার জন্য বাড়িতে আসছেন। দেনার দায়ে কখনো বাড়ি থাকছি, আবার কখনো পালিয়ে থাকছি। সংসার চলছে না। আমার ওপর চরম নির্যাতন গেছে, সব মেনে নিয়েছি। এখন টাকাগুলো ফেরত পেলে বেঁচে যেতাম।’

Link copied!