ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের এক যুগ : সেদিন যা ঘটেছিল

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের এক যুগ : সেদিন যা ঘটেছিল

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে একটি বিভীষিকাময় দিন। আদালত থেকে জামিন নিয়ে প্রাইভেট কারে ঢাকায় ফিরছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগী। বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় সাদাপোশাকে র‍্যাবের একটি দল তল্লাশিচৌকি বসিয়ে নজরুলসহ পাঁচজনকে তুলে নিয়ে যায়। একই সড়ক থেকে প্রায় একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিমও নিখোঁজ হন।

তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও পরদিন আরেকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কাউন্সিলর, আইনজীবীসহ সাতজনের হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। র‍্যাবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

আলোচিত সেই সাত খুনের এক যুগ পূর্ণ হচ্ছে আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল)। কিন্তু এখনো বিচারের রায় কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্বজনদের।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাত খুনের মামলায় র‍্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, কমান্ডার এম এম রানা, আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন দণ্ডিত ব্যক্তিরা। হাইকোর্ট ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল ও অপর ১১ আসামির দণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ৯ আসামির দণ্ড বহাল থাকে। দণ্ডিত তারেক সাঈদ, নূর হোসেনসহ মামলার বেশ কয়েকজন আসামি বর্তমানে কারাগারে আছেন।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) পর্যায়ে রয়েছে।

তল্লাশিচৌকি বসিয়ে অপহরণ

সেদিন দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে জামিন পান সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু লিটন হোসেন, যুবলীগ কর্মী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাঁর গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও শেখ রাসেল জাতীয় শিশু–কিশোর পরিষদের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার কমিটির সহসভাপতি তাজুল ইসলাম।

বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় পৌঁছালে লে. কমান্ডার এম এম রানার নেতৃত্বে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে সাদাপোশাকের র‍্যাব সদস্যরা নজরুলের গাড়ির গতিরোধ করেন। সেখান থেকে নজরুলসহ পাঁচজনকে অপহরণ করে মেজর আরিফ হোসেন তাঁর মাইক্রোবাসে তুলে নেন বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে।

একই সময়ে ওই সড়ক দিয়ে যাওয়া প্রবীণ আইনজীবী চন্দন সরকার ঘটনাটি দেখে ফেলেন। পরে চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়ির চালক ইব্রাহিমকে আরেকটি গাড়িতে র‍্যাব-১১–এর কমান্ডার এম এম রানা তাঁর মাইক্রোবাসে তুলে নেন, যাতে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকে। এতে অপহৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত।

অপহরণের পর উত্তেজনা

কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম অপহরণের খবর জানাজানি হলে ওই দিন বিকেল থেকেই সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নজরুলের সমর্থকেরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। যানবাহন ভাঙচুর, সড়ক অবরোধে স্থবির হয়ে পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও র‍্যাব গিয়ে লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ঘটনার পর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ বেশ কয়েকজনের বিরোধ রয়েছে। নূর হোসেন ও তাঁর লোকজন র‍্যাব পরিচয়ে তাঁর স্বামীসহ পাঁচজনকে অপহরণ করেছেন। তিনি স্বামীকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত চান।

ওই অভিযোগ অস্বীকার করে নূর হোসেন ঘটনার পর বলেছিলেন, নজরুল অপহরণের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে এ ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততা নেই।

তিন দিন পর লাশ উদ্ধার

অপহরণের তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে ছয়টি লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন উদ্ধার হয় আরও একটি মরদেহ। ময়নাতদন্তে উঠে আসে নির্মমতার চিত্র—প্রথমে মাথায় আঘাত করা হয়। এরপর গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা। মরদেহ যাতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য পেটের নিচে ছিদ্র করে দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়ির চালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় চন্দনের জামাতা বিজয় কুমার পালও ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।

এদিকে আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত খুনের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির আইনজীবীরা আদালত বর্জন এবং সাত খুনের সঙ্গে জড়িত র‍্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। সাত খুনের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি এ হত্যাকাণ্ডের গণশুনানি করে প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য রেকর্ড করে। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৭ মে গ্রেপ্তার করা হয় র‍্যাব-১১–এর অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন এবং পরদিন গ্রেপ্তার হন লে. কমান্ডার এম এম রানা।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নূর হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে জেলা প্রশাসন। নূর হোসেনের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

নৃশংসভাবে সাতজনকে হত্যা

পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তে র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন, এম এম রানাসহ র‍্যাব কর্মকর্তাদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে নজরুলসহ সাতজনকে অপহরণ ও হত্যার নৃশংস বিবরণ।

জবানবন্দির বর্ণনা অনুযায়ী, সাতজনকে অপহরণের পর র‍্যাবের মাইক্রোবাসে করে নরসিংদী এলাকায় নিয়ে চলে যান আরিফ হোসেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাঁচপুর সেতুর নিচে সাতজনকে চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করা হয়। পরে সাতজনের মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। লাশ গুম করতে কাঁচপুর সেতুর নিচ থেকে রাত একটার দিকে র‍্যাবের ট্রলারে তুলে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে মেঘনা নদীর মোহনায় চলে যান। সেখানে মরদেহের সঙ্গে ১২টি করে ইটের একেকটা সেট বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

সাত খুনের নেপথ্যে

সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সঙ্গে ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শাখার তৎকালীন সহসভাপতি নূর হোসেনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ছিল। নূর হোসেন ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের একটি রাস্তা প্রশস্ত করা নিয়ে নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের ফুফাতো ভাই মোবারকের বিরোধ দেখা দেয়। এ থেকে নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের বিরোধ তীব্র হয়। এ ঘটনায় নূর হোসেনের ফুফাতো ভাই মোবারক বাদী হয়ে নজরুলকে আসামি করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজির হয়ে জামিন পেয়ে ঢাকার যাওয়ার পথে নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগীসহ পাঁচজনকে র‍্যাব-১১ অপহরণ করে।

নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নূর হোসেন সেদিন পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামী নজরুলকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে র‍্যাবকে ব্যবহার করে অপহরণ করেছিল। আমার স্বামীকে প্রাণে মেরে না ফেলার জন্য ওই সময় তারেক সাঈদের পায়েও ধরেছিলাম। কিন্তু র‍্যাব আমার স্বামীসহ সাতটি মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়।’ তিনি বলেন, সরকারের একটি বাহিনী যেভাবে সাতটি মানুষকে হত্যা করেছে, তা সারা দেশের মানুষ দেখেছে।

অপহরণের ঘটনার পরপর নজরুলের শ্বশুর শহীদ হোসেন প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, নূর হোসেনের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নিয়ে র‍্যাব-১১ অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ তাঁর জামাতাকে অপহরণ করেছেন। তাঁর এ অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি ও আলোচিত এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চন্দন সরকার অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় তাঁকেসহ সাতজনকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাবের সদস্যরা। বিষয়টি জানার পর পুলিশ ও র‍্যাবের অফিসে যাই, তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাই। র‍্যাবের কাছে গেলেও তারা অস্বীকার করে। চন্দন সরকার, নজরুলসহ সাতজনের ঘটনায় আমরা ৫৮ দিন এক ঘণ্টা করে আদালত বর্জন করেছি এবং আদালত প্রাঙ্গণে রাজপথে আন্দোলন শুরু করি। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করলে আসামি আসামিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।’

সাত খুন মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম গত শুক্রবার আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিচারের রায় হয়েছে, কিন্তু রায় কার্যকর হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় কষ্টের। শুধু নিহত ব্যক্তিদের পরিবার নয়, দেশবাসীও এ রায় কার্যকর দেখতে চান। সুপ্রিম কোর্টে এই রায় কেন ঝুলে আছে, আমরা জানি না। এক যুগ ধরে আমরা প্রচণ্ড হতাশায় ভুগছি। সরকার চাইলেই খুনিদের বিচারের রায় কার্যকর হবে।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মুঠোফোনে বলেন, ‘চূড়ান্ত বিবেচনায় ভুক্তভোগীরা যেমন বিচার পাবেন, তেমনি আসামিরাও ন্যায়বিচার পাবেন—এটা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা যত দ্রুত সম্ভব, এই মামলার শুনানি সম্পন্ন করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করব।’

Link copied!