ঢাকা শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২
amaderkhobor24.com

পচা ডিম ও বাসি রুটির স্কুল ফিডিং, তবুও সারাদেশে সম্প্রসারণের ছক!

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

পচা ডিম ও বাসি রুটির স্কুল ফিডিং, তবুও সারাদেশে সম্প্রসারণের ছক!

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে চালু হওয়া ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি নানা সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের মুখে পড়েছে। টেন্ডার জট ও আইনি জটিলতায় অনেক এলাকায় খাদ্য সরবরাহে বিলম্ব হলেও সরকার আগামী জুন-জুলাই মাস থেকেই এই কর্মসূচি সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।

বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডিম, দুধ, বিস্কুট, বনরুটি ও ফলসহ পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে। তবে, বিভিন্ন এলাকায় পচা বা কাঁচা ডিম, মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি এবং নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নজরদারি বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

খাবারের মান নিয়ে মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ

মাঠপর্যায়ে খাবারের মান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন দেশের উত্তরাঞ্চলের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে ধরে রাখতে বনরুটি, ডিম ও কলা দেওয়া হলেও বাস্তবে নানা অব্যবস্থাপনা দেখা যাচ্ছে।

dhakapost
১৫০টি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডিম, দুধ, বিস্কুট, বনরুটি ও ফলসহ পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে / ছবি- ঢাকা পোস্ট 

তিনি একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘এক দিন আমার স্কুলে আসা বনরুটির প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ লেখা ছিল ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, অথচ সেদিন ছিল ২৫ জানুয়ারি। ভবিষ্যতের তারিখ দুই দিন আগেই কীভাবে লেখা থাকে, তা দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়েছি। প্রমাণ হিসেবে আমি সেই প্যাকেটের ছবিও তুলে রেখেছি।’

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে খাবারের মান নিয়ে মাঠপর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের এক বিদ্যালয়ে বনরুটির প্যাকেটে দুদিন পরের ‘ভবিষ্যতের উৎপাদনের তারিখ’ ব্যবহারের ঘটনা চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে পচা ডিম, কাঁচা ডিম এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের পাউরুটি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাবার সময়মতো না পৌঁছানো এবং পরিমাণে কম দেওয়ার ফলে শিশুদের মধ্যে এই খাবারের প্রতি আগ্রহ কমছে

শুধু উত্তরাঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও একই অভিযোগ— নিম্নমানের বা নষ্ট খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাবার পৌঁছাতে যেমন দেরি হয়, তেমনি পরিমাণেও কম দেওয়া হয়। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার নেওয়ার আগ্রহ কমছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান, খাবারের মান ও সরবরাহে অনিয়মের কারণে তারা প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘কিছু জায়গায় মান ঠিক থাকলেও অনেক সময় কাঁচা ডিম বা অতিরিক্ত পাকা ফল দেওয়া হয়। উদ্যোগটি চমৎকার হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি না থাকলে এর আসল উদ্দেশ্য সফল হবে না।’

dhakapost
বিভিন্ন এলাকায় পচা বা কাঁচা ডিম, মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি এবং নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে / ছবি- ঢাকা পোস্ট

খাদ্যতালিকা ও প্রকল্পের লক্ষ্য

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান প্রকল্পের আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের নির্বাচিত ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ ১৩ হাজার শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা তিনটি অংশে টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও টেন্ডার জট ও আইনি মামলার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ২০টি জোনের মধ্যে ১২টিতে যোগ্য সরবরাহকারী না পাওয়া এবং বিস্কুট সরবরাহ নিয়ে সাতটি বিভাগে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিস্কুট সরবরাহের বিষয়টি বর্তমানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির শুনানিতে রয়েছে, যা নিষ্পত্তি হলেই কেবল নিয়মিত সরবরাহ ফিরবে

সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসেই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় ফর্টিফাইড বিস্কুট, কলা বা মৌসুমি ফল, বনরুটি, ডিম এবং ইউএইচটি দুধ। নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী— প্রতি রোববার বনরুটির সঙ্গে সেদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি ও ২০০ গ্রাম ইউএইচটি দুধ, মঙ্গলবার ৭৫ গ্রামের ফর্টিফাইড বিস্কুট ও ফল এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার বনরুটির সঙ্গে সেদ্ধ ডিম দেওয়া হয়।

এই বিশেষ খাদ্যতালিকা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় মোট এনার্জির ২৫.৯ শতাংশ, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ৩২.২ শতাংশ, প্রোটিনের ১৬.৪ শতাংশ এবং ফ্যাটের ২১.৭ শতাংশ পূরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

dhakapost
সরকার আগামী জুন-জুলাই মাস থেকেই ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে / ছবি- ঢাকা পোস্ট

টেন্ডার ও আইনি জটিলতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার সরবরাহ কার্যক্রমকে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে— ইউএইচটি দুধ, ফর্টিফাইড বিস্কুট এবং ‘ফুড বাস্কেট’ (বনরুটি, ডিম ও ফল)।

ফুড বাস্কেট সরবরাহের জন্য পুরো দেশকে ২০টি জোনে ভাগ করা হলেও প্রথম দফায় মাত্র আটটি লটে যোগ্য সরবরাহকারী পাওয়া যায়। বাকি ১২টি লটের জন্য পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করে সরবরাহকারী নিশ্চিত করা হয়েছে। দুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আটটি বিভাগের মধ্যে প্রথম দফায় চারটি বিভাগে সরবরাহকারী পাওয়া গেলেও বাকি চারটির জন্য পুনরায় ই-টেন্ডার করতে হয়েছে।

অন্যদিকে, ফর্টিফাইড বিস্কুট সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। সাতটি বিভাগ নিয়ে আদালতে মামলা হওয়ায় বিষয়টি বর্তমানে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি’র শুনানিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই আইনি সংকট দ্রুত নিষ্পত্তি হলে সব খাবার নিয়মিত সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

dhakapost
খাবারের মান নিয়ে আসা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে — প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান / ঢাকা পোস্ট

অনিয়ম ঠেকাতে সরকার শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিবহন সমস্যা কমাতে স্থানীয়ভাবে ডিম ও ফল সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানের ১৫০টি উপজেলার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আগামী জুন-জুলাই মাস থেকে ধাপে ধাপে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করার কাজ চালাচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও জিরো টলারেন্স নীতি

বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা চাই শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নির্ধারিত সব খাবার যেন সময়মতো হাতে পায়। খাবারের মান নিয়ে আসা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’

ঢাকায় বসে পুরো দেশের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা বাড়ানো হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) তদারকিতে আরও সক্রিয় করা এবং প্রয়োজনে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া হবেআবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

তিনি স্পষ্ট করে জানান, প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন কোনোভাবেই মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ, কম ওজনের পাউরুটি বা পচা ফল গ্রহণ করা না হয়। শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং যেকোনো অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

dhakapost
 জুন-জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলাকে ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে— প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ / ঢাকা পোস্ট

সরবরাহ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে ডিম ও ফল সংগ্রহের পরিকল্পনা চলছে। মহাপরিচালক বলেন, ‘ঢাকায় বসে পুরো দেশের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা বাড়ানো হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) তদারকিতে আরও সক্রিয় করা এবং প্রয়োজনে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্কুল ফিডিং শুধু একটি খাবার কর্মসূচি নয়, এটি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং তাদের বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করার একটি বড় উদ্যোগ। আমরা চাই দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী এর সুফল পাক। জুন-জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবেববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সীমিত পরিসরের এই কর্মসূচিকে ধাপে ধাপে সারাদেশে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন-জুলাই মাস থেকে সম্প্রসারিত কার্যক্রম শুরু হতে পারে। নতুন ধাপে খাবার সরবরাহের পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হবে। সব উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘স্কুল ফিডিং শুধু একটি খাবার কর্মসূচি নয়, এটি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং তাদের বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করার একটি বড় উদ্যোগ। আমরা চাই দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী এর সুফল পাক। জুন-জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।’

Link copied!