ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে নারী অভিনয়শিল্পীদের ক্যারিয়ার ও গ্ল্যামারের ক্ষেত্রে ‘বয়স’ যে এখনো একটি বড় অদৃশ্য দেয়াল এবং বৈষম্যের প্রধান হাতিয়ার, সে বাস্তবতাই এবার অত্যন্ত সাহসীভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন বলিউড ও দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাপসী পান্নু। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বলিউড এবং দক্ষিণী চলচ্চিত্র—উভয় অঙ্গনেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বয়সভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
এমনকি তার বয়স ৩০ বছর পেরোনোর পরপরই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের কাছ থেকে তাকে শুনতে হয়েছে যে, তিনি নাকি আর কোনো বাণিজ্যিক রোমান্টিক-কমেডি ছবির মূল নায়িকা হওয়ার মতো ‘যথেষ্ট তরুণ’ নন। ‘টাইমস এন্টারটেইনমেন্ট’-কে দেওয়া এক বিশেষ ও অকপট সাক্ষাৎকারে নিজের ক্যারিয়ারের এই নির্মম ও বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন এই প্রতিভাবান অভিনেত্রী।
সাক্ষাৎকারে তাপসী পান্নু বলেন, তিনি যখন প্রথম বলিউডে পা রাখেন, তখন তার বয়স ছিল মাঝ-কুড়ির ঘরে। কিন্তু অত্যন্ত প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও প্রথম তিন-চার বছর বলিউডের মূল ধারায় অর্থবহ ও শক্তিশালী কোনো চরিত্র পাওয়ার জন্য তাকে প্রতিনিয়ত তীব্র সংগ্রাম করতে হয়েছে। আর যখন নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হলেন, তখনই সম্পূর্ণ নতুন ও অদ্ভুত এক লিঙ্গভিত্তিক সমস্যার মুখোমুখি হন তিনি।
তাপসীর ভাষায়, ‘বলিউডে নিজেকে একজন দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে করতেই আমার বয়স ৩০ পেরিয়ে যায়। আর ঠিক তখনই একদল নীতিনির্ধারক আমাকে বললেন, তুমি আর রোমান্টিক–কমেডি ছবিতে অভিনয়ের জন্য যথেষ্ট তরুণ নও। এখনো অনেক সিনেমার কাস্টিংয়ের সময় এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি হয়, যখন চিত্রনাট্য পড়ে আমার মনে হয় এই চরিত্রটির জন্য তো খুব কম বয়সী কোনো মেয়ের প্রয়োজন নেই; তবু পরিচালকেরা জোর করে কম বয়সী কোনো নায়িকাই খোঁজে। অথচ পুরুষ অভিনেতাদের ক্ষেত্রে কিন্তু এই বয়সের নিয়ম বা ছক কখনোই খাটানো হয় না। আমরা সবাই পর্দায় সেটা নিয়মিত দেখতে পাই যে, পুরুষদের বয়স ৫০-৬০ হলেও তারা তরুণীদের সাথে রোমান্স করছে। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এই জেন্ডার ও বয়স বৈষম্য সত্যিই এক বিশাল বড় মানসিক ব্যাধি।’
বলিউডের পাশাপাশি দক্ষিণী চলচ্চিত্রে কাজ করার সময়ও তাকে একই ধরনের সংকীর্ণ ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানান তাপসী। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণে যখন আমি তুলনামূলক বয়স্ক বা বেশ প্রতিষ্ঠিত কোনো শীর্ষ নায়কের বিপরীতে কোনো ছবিতে অভিনয় করেছি, তখন অনেক সমসাময়িক তরুণ অভিনেতা আমার সঙ্গে পরবর্তীতে কাজ করতে চাইতেন না। তাদের ধারণা ছিল, ও তো অমুক সিনিয়র অভিনেতার নায়িকা হয়ে গেছে, তাই এখন আর আমাদের সাথে মানাবে না।’
এই সংকীর্ণতার উদাহরণ টেনে এবং পুরুষ তারকাদের বিশেষ সুবিধার দিকে আঙুল তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এই কথা কি কেউ কখনো বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে বলতে সাহস পাবে? শাহরুখ খানের সঙ্গে কাজ করার পর তো একজন নবাগত অভিনেত্রীর পুরো জীবন ও ক্যারিয়ারই রাতারাতি বদলে যেতে পারে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সবসময় এমন একধরনের অদ্ভুত ও অলিখিত ট্যাবু বা নিষেধাজ্ঞা কাজ করত, যা ভীষণ হতাশাজনক।’
দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রির এই নোংরা ইঁদুরদৌড় ও অসম পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর একসময় তিনি নিজের মানসিক শান্তির জন্য এই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাপসী পান্নু জানান, ক্যারিয়ারে অসংখ্য ধাক্কা, তীব্র হতাশা এবং মানসিক ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর তিনি এখন আর তথাকথিত কমার্শিয়াল সিনেমার পেছনে দৌড়াচ্ছেন না। বরং তিনি এখন নিজের বাস্তবের বয়সের সঙ্গে মানানসই এবং যেসব চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করলে তার শিল্পীমন তৃপ্ত হয়, কেবল সেগুলোকেই বেছে বেছে কাজ করছেন।
উল্লেখ্য, তাপসীকে সর্বশেষ দেখা গেছে খ্যাতনামা পরিচালক অনুভব সিনহার তুমুল আলোচিত কোর্টরুম ড্রামা ‘অ্যায়সি’ সিনেমায়। ছবিটিতে তিনি একজন লড়াকু আইনজীবীর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন, যিনি ধর্ষণের শিকার এক অসহায় নারীর জন্য ন্যায়বিচার আদায়ে আদালতের ভেতর একাই লড়াই করেন। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা ও বাহবা পেলেও বক্স অফিসে আশানুরূপ সাফল্য পায়নি, তবে বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় ওটিটি বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে দর্শকরা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।