কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক। ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে এবং জলাবদ্ধতার কারণে আধপাকা ও পাকা ধান নষ্ট হওয়ায় এসব কৃষকের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে হাওরে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে কৃষকদের কষ্টের ফসল। কীভাবে সংসার চালাবেন আর ঋণ পরিশোধ করবেন; তা নিয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন লাখো কৃষক। কেউ কেউ ডুবেচুবে ধান কাটলেও আশার আলো দেখছেন না।
কিশোরগঞ্জের হাওরে কৃষকদের কান্না
‘গত কয়েকটা দিন শ্রমিক সংকটের কারণে পাকা ধানগুলো কাটতে পারি নাই। অল্প কিছু কেটেছি। এখন বেশিরভাগ কাটার আগেই পানির নিচে চলে গেলো। এত কষ্টের ধান চোখের সামনেই তলিয়ে গেলো। কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারছি না। এখনও পানি আসছে। মনে হয় না এসব ধান আর রক্ষা করতে পারমু।’
গত তিন দিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে। পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কষ্টের কথা জানালেন অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম। তার মতো অবস্থা হাওরাঞ্চলের সব কৃষকের। বেশিরভাগ ধান পানিতে ডুবে যাওয়ায় হাহাকার করছেন অন্তত ১০ হাজারের বেশি কৃষক।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, হাওরে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে এ পর্যন্ত ২ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি অনুযায়ী, এর পরিমাণ আড়াই হাজার হেক্টর।
কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তলিয়ে আছে অষ্টগ্রাম হাওরের অন্তত দেড় হাজার হেক্টর বোরো জমি। এখনও অনবরত নদী উপচে পানি ঢুকছে হাওরে। গত দুদিনের বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা বন্ধ পুরো হাওরে। এখন কোমর-সমান পানি। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে এসব ধান না কাটলে সব পচে নষ্ট হবে।
নিকলী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুদিন এমন ভারী বৃষ্টি থাকবে।

গত তিন দিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে
পানিতে তলিয়ে গেছে অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কৃষক ফুল মিয়ার সারা বছরের স্বপ্ন। তিনি এবার ধানের আবাদ করেছিলেন ১০ একর জমিতে। সব ধান এখন পানির নিচে। যেগুলো কয়েকদিন পর ঘরে তোলার কথা ছিল, যা দিয়ে সারা বছর সংসার চালানোর কথা; সেই ধান হারিয়ে এখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন এই কৃষক। তিনি বলেন, ‘জমিতে বুক সমান পানি। তার নিচে আমার কষ্টের ধান। জানি না অন্তত কিছু রক্ষা করতে পারবো কিনা। এত বড় আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবো না। কী খেয়ে বাঁচবো।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ করা ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ৫০ শতাংশ কাটা শেষ হয়েছে। এবার আগেভাগেই কৃষকদের ৮০ ভাগ ধান পাকলেই কাটার পরামর্শ দিয়েছিল কৃষি বিভাগ। এখন ৫০ শতাংশ ধান আধাপাকা অবস্থায় কাটতে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষকরা চেষ্টা করলেও তাতেও আর কোনও লাভ হচ্ছে না। অধিকাংশ ডুবে গেছে। আবার বৃষ্টির কারণে কাটাও যাচ্ছে না। আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারও কিছুই করার থাকে না। তবুও যদি আবহাওয়া একটু ভালো হয়, ডুবে যাওয়া ধান কাটা যাবে।’
সুনামগঞ্জে ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান। চোখের সামনে এসব পাকা-আধা পাকা ধানক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে নেমেছে হাহাকার। এখনও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল নামছে। এতে হাওর ও নদীতে পানি বেড়ে তলিয়ে যাচ্ছে জমির ধান। ডুবে যাওয়া জমি থেকে ধান তোলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন জেলার অন্তত আট-নয় লাখ কৃষক।
সুনামগঞ্জে সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। পানির চাপে দুই উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবে গেছে। বুধবারও জেলার বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জে হাওরের ৪৪ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো আবাদের অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা এখনও বাকি। এরই মধ্যে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে। যার পরিমাণ ১০ হাজার হেক্টরের বেশি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও পাহাাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছোট-বড় ২০টি হাওর তলিয়ে গেছে। এসব হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ভারতীয় ঢলে এসব ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। এখনও তলিয়ে যাচ্ছে। হাওরের পানি ও নদীর পানি সমান্তরালে প্রবাহিত হওয়ায় নিষ্কাশনের কোনও সুযোগ নেই। গত দুদিন পানির মধ্যে ধান কাটলেও আজ কাটারও কোনও অবস্থা নেই।
শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার কৃষকরা জানিয়েছেন, জমির ফসল ডুবে যায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। হাওরে পানির চাপ, বজ্রপাত আতঙ্কের মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকটসহ নানা কারণে সংকট গভীর তৈরি হয়েছে। সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের জমির ধান তলিয়ে গেছে। আবার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকের শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে।

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। জেলায় এ পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। সবমিলিয়ে হাওর ও নন হাওরে ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। হাওরে বোরো ধান কাটায় এখন কৃষকরা হারভেস্টর মেশিনের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। শিলাবৃষ্টিতে ৫৩৮ হেক্টর ও জলাবদ্ধতায় ১ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না নামলে আরও কিছু জমির ধান পচে নষ্ট হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার জন্য। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে।’
আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার ও বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হওয়ায় নামছে উজানের পাহাড়ি ঢল। এতে হাওরে ও নদীতে দ্রুত পানি বাড়ছে। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের জমির ধান।
হবিগঞ্জে পাঁচ হাজার একর জমির ধান তলিয়ে গেছে
হবিগঞ্জের চার উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার একর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। যারা জমি থেকে ফসল কাটতে পেরেছেন, তাদের ধানও মাঠে ভিজছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা।
এ অবস্থায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় হাজার হাজার কৃষক অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা সরকারি সহায়তা দাবি করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, ‘টানা বৃষ্টির আশঙ্কা থেকে কৃষকদের আগেই সতর্ক করে পাকা ধান দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। গত কয়েকদিনে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে আমাদের মাঠের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’
এদিকে বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীর পানিও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই পানি হাওরে প্রবেশ করে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। চারটি উপজেলায় যে ফসল তলিয়েছে সেখানে ১০-১২টি হাওর রয়েছে। টানা বৃষ্টিপাত এবং পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেননি।
এমনকি খলায় থাকা ধানও তোলা যায়নি গোলায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ডুবে যাওয়া জমি থেকে ধান উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেককে পানির নিচ থেকে ধান কেটে তুলতে দেখা যায়। এতে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ‘কৃষকদের কান্না কেউ দেখছে না। সারা বছরের সোনালি ফসল এভাবে চোখের সামনে তলিয়ে যাবে ভাবতে পারছি না। এভাবে হলে আমরা কীভাবে বাঁচবো। আমার আট বিঘা জমির সবটুকু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলমু বুঝতেছি না।’
নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ গ্রামের কৃষক রহমান উল্লাহ বলেন, ‘জমিতে ধান পেকে গেছিল। আর কদিন পরই ঘরে তোলার সময়। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজানের পানি দ্রুত জমিতে উঠে যায়। যে কারণে পাকা ধান জমিতেই তলিয়ে গেছে।’
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিরাট গ্রামের কৃষক জিহান আহমেদ বলেন, ‘আমাদের উপজেলা ভাটি অঞ্চল হওয়ায় বৃষ্টির পানিই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওরের সব নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে।’
মৌলভীবাজারে এক হাজার হেক্টর ধান তলিয়ে গেছে
মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে অন্তত এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জেলাজুড়ে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মূলত পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া ও বালিয়াছড়ার বাঁধ ভেঙে জেলার প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এর মধ্যে জুড়ী উপজেলার শাহপুর ও আশপাশের এলাকায় ঢলের পানিতে প্রায় ৩,৫০০ বিঘা (প্রায় ৪৬৬ হেক্টর) আধা পাকা বোরো ধানক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া ও জুড়ী অংশের এলাকায় অন্তত ১৯০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে যাওয়া খবর পাওয়া গেছে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকেরা জানান, গত তিন দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে আগাম বন্যার মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এতে হাওরের পাশাপাশি জেলার হাওর এলাকার বাইরে নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। পাকা ধান ঘরে তুলতে না পারায় অনেক কৃষক চরম হতাশায় পড়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়। হাওরের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে, বাকিটা হাওর এলাকার বাইরে রয়েছে। তবে ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেশি নয়।
কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার কেওলার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইভাবে রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের ধানক্ষেত প্লাবিত হয়।
মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে অন্তত এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে
কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কৃষক জুনেদ মিয়া বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। ঋণ করে ধান চাষ করেছিলাম। প্রতি একরে প্রায় ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কাটার সময়ই ধান ডুবে গেলো।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বুধবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সবমিলিয়ে ৮৯৭ হেক্টর ফসল পানিতে ডুবেছে। তবে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। হাওরে ধানা কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। সামান্য ধান কাটার বাকি রয়ে গেছে। আশা করি বৃষ্টি কমলেই ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।’
নেত্রকোনায় অর্ধেক ধান পানির নিচে
নেত্রকোনায় মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার ৯টা পর্যন্ত মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিতে পানি বেড়ে হাওরে কৃষকের চোখের সামনেই ক্ষেতের পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়।
পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তলিয়ে যায়। এ নিয়ে আতঙ্কে আছেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো অকালবন্যায় ফসল হারাতে হবে। হাওরে মাত্র ৫২ শতাংশ ক্ষেতে ধান কাটা হয়েছে। বাকি সব পানির নিচে। ফসলহানি ঘটলে কৃষকদের সারা বছরের আয়ে বিপর্যয় নামবে।
হাওরে এবার ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর ক্ষেতে বোরো আবাদ হয়েছে। জেলায় ধানের মোট আবাদ ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। গত কয়েক বছর হারভেস্টার যন্ত্র দিয়ে কৃষকরা ধান কেটেছেন। পাশাপাশি শ্রমিক দিয়েও ধান কাটা হতো। কিন্তু এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র সেখানে চালানো যাচ্ছে না। আর শ্রমিকসংকট আছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হওয়ায় কৃষকরা মাঠে ধান কাটতে ভয় পাচ্ছেন। গত এক মাসে বজ্রপাতে হাওরে পাঁচ জন প্রাণ হারান। অন্যদিকে অতিবৃষ্টির পানিতে পাকা ধান ডুবে যাচ্ছে।

নেত্রকোনায় বৃষ্টিতে পানি বেড়ে হাওরে কৃষকের চোখের সামনেই ক্ষেতের পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালিয়াজুরির ছায়ার হাওর, বায়রা হাওর, চুনাই হাওর, বাইদ্যার চর, কাটকাইলেরকান্দা, নন্দের পেটনা, কীর্তনখলা, রয়াইল, মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা, মদনের গোবিন্দশ্রী, উচিতপুর, কদমশ্রী, কলমাকান্দার সোনাডুবি, গোরাডোবা, আঙ্গাজুরা, মহিষাশুরা, মেদী, তেলেঙ্গাসহ বেশ কিছু হাওরের পানিতে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেতে হাঁটুর ওপরে পানি জমেছে।
মদনের কুলিহাটি গ্রামের কৃষক আসাদুল্লাহ রিয়াদ বলেন, ‘উচিতপুর হাওরে পানিতে আমার পাঁচ এক জমির ধান তলিয়ে গেছে। যে ক্ষেতের ধান এখনও ভেসে আছে, তাও কাটতে পারছি না শ্রমিকের অভাবে।’
খালিয়াজুরির কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘পানিতে বিভিন্ন হাওরে ৫০০ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। এখনও উপজেলায় অর্ধেক ক্ষেতের ধান কাটা বাকি।’
খাগড়াছড়িতে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি
খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দীঘিনালা, মাটিরাঙা ও মহালছড়ি উপজেলায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাথমিক তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে প্রায় ২২১ হেক্টর বোরো পাকা ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি ও ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আম ঝরে পড়ায় আমচাষিরাও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
জেলার বোরো মৌসুমের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে পেকে গিয়েছিল। এমন অবস্থায় হঠাৎ ভারী বর্ষণ ও ঢলের পানিতে অনেক ক্ষেত তলিয়ে গেছে। দীঘিনালার নিম্নাঞ্চলে বহু কৃষকের ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে
দীঘিনালার হর্টিকালচার এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, ‘পাঁচ একর জমিতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধান কাটার আগেই সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। আমার এ ধানক্ষেত ছাড়া আর কোনও আয়রোজগার নেই। প্রতি বছর কিছু ধান বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাই। এখন কী খাব আর কীভাবে চলবো, কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে তা ঢাকায় পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।