প্রতীকী ছবি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহ এবং শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি হাসপাতাল নিয়ে মানুষের নানা অভিযোগ।
এমন বাস্তবতায় চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত সাত মাসে তাঁর কার্যক্রমে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে—হাসপাতালভিত্তিক সরাসরি তদারকি, দুর্নীতি ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান, বড় পরিসরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবার অটোমেশন, ই-হেলথ কার্ড, জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সম্প্রসারণ, টিকাদান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন স্বাস্থ্য অবকাঠামোর পরিকল্পনা।
এগুলোকে একসঙ্গে দেখলে স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনিক সংস্কার ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণের একটি রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাসপাতালের বাস্তব চিত্র জানতে মাঠে মন্ত্রী
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বকালের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন। ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল তিনি পরিদর্শন করেছেন। এসব পরিদর্শনে জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, চিকিৎসকদের উপস্থিতি, পরিচ্ছন্নতা, ওষুধের মজুত ও রোগীদের সেবার বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো আকস্মিক পরিদর্শনের সময় দীর্ঘদিন অনুমোদিত ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে দুই চিকিৎসকসহ তিনজনকে বরখাস্ত করার খবরও প্রকাশিত হয়।
এই ধরনের মাঠপর্যায়ের তদারকি স্বাস্থ্য প্রশাসনের জবাবদিহির প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে।
দালালমুক্ত হাসপাতালের ঘোষণা
সরকারি হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের হয়রানি এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের অভিযোগ। দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, রোগীদের কাছ থেকে ট্রলি ভাড়া বা অন্য কোনো উপায়ে অবৈধ অর্থ নেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং দালালমুক্ত হাসপাতাল নিশ্চিত করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। সেপ্টেম্বরেও তিনি দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল দালালমুক্ত করার ঘোষণা দেন।
অর্থাৎ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় শুধু চিকিৎসা নয়, রোগীর নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত সেবার পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকারে এসেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। জুলাইয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বদলি নয়, চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সংসদে তিনি স্বাস্থ্য খাতে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা জানান।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত অবস্থানকে স্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, অডিট ও নিয়মিত জবাবদিহির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
জনবল সংকট মোকাবিলায় বড় উদ্যোগ
স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা জনবল সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার কথা সংসদে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগ পরিকল্পনা—অর্থাৎ পুরো এক লাখ জনবল ইতোমধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এমন নয়।
স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ বিভিন্ন শ্রেণির জনবল ঘাটতি পূরণ হলে সরকারি হাসপাতালের সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
৮৭ সরকারি হাসপাতালে অটোমেশন
স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল রূপান্তরে ইতোমধ্যে একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, দেশের ৮৭টি সরকারি হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল অটোমেশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর আওতায় ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা, ফার্মেসির ওষুধ বিতরণ ও ট্র্যাকিং, সেবামূল্য আদায় এবং রেফারেল ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত।
এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কাগজনির্ভরতা কমিয়ে তথ্যভিত্তিক সেবা ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এ ছাড়া জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে ই-টিকিটিং চালু হয়েছে।
ই-হেলথ কার্ড: স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের অন্যতম বড় পরিকল্পনা হচ্ছে ই-হেলথ কার্ড। সরকার ছয়টি জেলায় পাইলট ভিত্তিতে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। জেলাগুলো হলো—খুলনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, নোয়াখালী, ঝালকাঠি ও নরসিংদী। এই উদ্যোগের লক্ষ্য রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—এটি এখনো সর্বদেশব্যাপী চালু হয়নি; পাইলট কার্যক্রম ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থা সফল হলে একজন রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা
কিডনি রোগীদের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা চালুর জন্য মেশিন কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং জেলা পর্যায়ে সেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী দুই বছরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এপ্রিলেই সংসদে জানানো হয়েছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে ৫৯টি সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর লক্ষ্য স্পষ্ট—কিডনি রোগীদের চিকিৎসার জন্য শুধু ঢাকা বা বড় শহরের ওপর নির্ভরতা কমানো।
৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে আরও বড় করার পরিকল্পনা
উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতেও বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুলাইয়ে জানান, দেশের ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে আগস্টে তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আধুনিক আল্ট্রাসাউন্ড ও প্যাথলজি সুবিধাসহ ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অর্থাৎ এই অংশটি মূলত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়াধীন উদ্যোগ—সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ক্যাথ ল্যাবের পরিকল্পনা
হৃদরোগের চিকিৎসা জেলা-উপজেলায় পৌঁছে দিতে চলতি বছরের মধ্যে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ক্যাথ ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এটি বাস্তবায়িত হলে হৃদরোগের জরুরি চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এত বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হামের বিরুদ্ধে বড় টিকাদান কর্মসূচি
গত সাত মাসে স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল হাম-রুবেলা টিকাদান। ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু।
২৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া আরও ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। এই বিশেষ কর্মসূচি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন ধাপের কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে ইউনিসেফ ও গাভির মাধ্যমে হামের ১৫ লাখ এবং টিটেনাস-ডিপথেরিয়ার ৯ লাখ ডোজ টিকা দেশে আনার তথ্যও মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্য
পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃ-প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী, ওষুধ ও সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সচেতনতামূলক প্রচারণার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এখানে লক্ষ্য শুধু পরিবার পরিকল্পনা নয়; মাতৃ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তৃণমূলে ‘হেলথ হাব’ ও ‘হেলথ ওয়েলবিং সেন্টার’
প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা আরও কাছে নিয়ে যেতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ‘হেলথ হাব’ এবং প্রতি তিনটি ওয়ার্ডে একটি করে ‘হেলথ ওয়েলবিং সেন্টার’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হেলথ হাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা এক ছাতার নিচে থাকবে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং স্তন ও জরায়ু ক্যানসারের প্রাথমিক শনাক্তকরণে স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করবেন। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিন
মানসিক স্বাস্থ্যকেও স্বাস্থ্যনীতির আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে বিশেষজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তরুণদের মানসিক চাপ, হতাশা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধেও বিশেষ কর্মসূচির কথা সংসদে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু শারীরিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানসিক স্বাস্থ্যকে এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করার দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নকল ও নিম্নমানের ওষুধের বিরুদ্ধে অবস্থান
নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের সরবরাহ বন্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সংসদে জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি ওষুধের অপব্যবহার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম ঠেকাতেও বিশেষ শনাক্তকরণ চিহ্ন ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বন্যা ও দুর্যোগে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ
স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি। জুলাইয়ে বন্যাকবলিত ১১ জেলার স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এ ধরনের ব্যবস্থা দুর্যোগের সময় হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কেও গুরুত্ব
স্বাস্থ্যসেবার মান শুধু হাসপাতাল বা যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না—চিকিৎসক ও রোগীর আচরণগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের রোগীদের সঙ্গে আন্তরিক, সম্মানজনক ও মানবিক আচরণের আহ্বান জানান।
এটি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও মানবিক করার প্রশাসনিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সামনে স্বাস্থ্য খাতের যে পরিবর্তনের পরিকল্পনা
গত সাত মাসের ঘোষিত ও চলমান উদ্যোগগুলোকে একত্রে দেখলে আগামী দিনের স্বাস্থ্য খাতের কয়েকটি বড় লক্ষ্য সামনে আসে—
১. পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ।
২. সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ও ই-হেলথ কার্ড ব্যবস্থা সম্প্রসারণ।
৩. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ।
৪. উপজেলা হাসপাতালের শয্যা, প্যাথলজি, আল্ট্রাসাউন্ড ও অন্যান্য অবকাঠামো আধুনিকায়ন।
৫. উপজেলা পর্যায়ে ক্যাথ ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা।
৬. প্রতিটি ইউনিয়নে হেলথ হাব এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে হেলথ ওয়েলবিং সেন্টার চালুর পরিকল্পনা।
৭. টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো।
৮. নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান এবং ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো।
৯. প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিশেষায়িত ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ।
১০. সরকারি হাসপাতালকে আরও জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও রোগীবান্ধব করা।
শেষ কথা
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সাত মাসকে স্বাস্থ্য খাতে একটি সংস্কার ও পুনর্গঠনের সূচনাপর্ব হিসেবে দেখা যায়। এই সময়ে শুধু নতুন হাসপাতাল বা নতুন যন্ত্রপাতির কথা নয়—জনবল, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, ওষুধের মান, ডায়ালাইসিস, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার বিভিন্ন উদ্যোগ সামনে এসেছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—সব উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনো শেষ হয়নি। কিছু ইতোমধ্যে চালু, কিছু বাস্তবায়নাধীন এবং কিছু পরিকল্পনা বা লক্ষ্যমাত্রা পর্যায়ে রয়েছে। তাই এই সাত মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিকল্পনার পরিধি এবং বাস্তবায়নের সূচনা।
আগামী দিনের সাফল্য নির্ধারিত হবে এসব পরিকল্পনা কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ই-হেলথ কার্ড, জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস, ইউনিয়ন পর্যায়ে হেলথ হাব, উপজেলা হাসপাতালের আধুনিকায়ন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যেকোনো সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হবে একটি সাধারণ রোগীর অভিজ্ঞতা।
তিনি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক পাবেন কি না, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাবেন কি না, পরীক্ষা করাতে অযথা হয়রানি হবে কি না, জরুরি মুহূর্তে দ্রুত চিকিৎসা পাবেন কি না এবং ঢাকার বাইরে থেকেও মানসম্মত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নির্ধারিত হবে পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য।
স্বাস্থ্য খাতের আগামী দিনের লক্ষ্য তাই শুধু হাসপাতাল বাড়ানো নয়; মানুষের দোরগোড়ায় সহজলভ্য, প্রযুক্তিনির্ভর, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
সাত মাসের উদ্যোগগুলো সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং মানুষের কাছে দৃশ্যমান ফলাফল।
লেখকঃ কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক