ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২
amaderkhobor24.com

বিবেকের দংশনে ৪৮ বছর পর বিনা টিকেটে ভ্রমণের টাকা ফেরত দিলেন মফিজুল

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

বিবেকের দংশনে ৪৮ বছর পর বিনা টিকেটে ভ্রমণের টাকা ফেরত দিলেন মফিজুল

১৯৭৬ সাল। চারদিকে সবুজ কাঁঠালের সমারোহ। গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে ট্রেনের ছাদে করে কাঁঠাল নিয়ে ঢাকার পথে ছুটতেন এক তরুণ। নাম তার মফিজুল ইসলাম। অভাবের সংসার, জীবিকার তাগিদ। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মতো সহজ ছিল না। টিকিট কাটার ঝক্কি এড়াতে তিনি চলতেন রেলের ছাদে। দায়িত্বরতদের হাতে গুঁজে দিতেন মাত্র ১টি টাকা। সেই টাকা রেলের কোষাগারে যেত না, যেত ব্যক্তির পকেটে।

সেদিন সেই ১ টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়া তরুণ আজ ৬০ বছরের বৃদ্ধ। সময়ের চাকা ঘুরেছে অর্ধশতাব্দী। মফিজুল ইসলাম আজ একজন সফল মানুষ, গড়ে তুলেছেন ‍‍`ফাতেমাতুজ যাহরা (রা.) মহিলা মাদরাসা‍‍`। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তার হৃদয়ের গহীনে বিষের মতো বিঁধে ছিল সেই ১ টাকার স্মৃতি।

শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান বেপারীর ছেলে মফিজুল ইসলামের জীবন বদলে গেলেও তার স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি সেই ছাদ-ভ্রমণ। তিনি অনুভব করেন, দায়িত্বরতদের দেওয়া সেই ১ টাকা সরকারের পাওনা শোধ করেনি। রেলওয়ে বঞ্চিত হয়েছে তার প্রাপ্য থেকে।

মফিজুল ইসলাম বলেন, "প্রায় দুই-তিন বছর আমি টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করেছি। যদিও দায়িত্বরতদের টাকা দিয়েছি, কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ তো আমার কাছে টাকা পায়। বিবেকের কাছে আমি দায়বদ্ধ ছিলাম। এই ঋণ নিয়ে কি পরপারে যাওয়া যায়?"

কত টাকা দিলে এই ঋণ শোধ হবে? ১৯৭৬ সালের সেই ১ টাকার মূল্য আজকের বাজারে কত? অনেক ভেবেচিন্তে তিনি নিজেই একটি অংক কষলেন। তার হিসেবে রেলের বকেয়া ২০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। যেই ভাবা সেই কাজ—পকেটে ২০ হাজার টাকা নিয়ে ছুটে গেলেন শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে।

স্টেশনে গিয়ে মফিজুল ইসলাম অনুরোধ করেন তাকে ২০ হাজার টাকার টিকিট দেওয়ার জন্য। হুট করে এক যাত্রী এত টাকার টিকিট কাটতে চাওয়ায় থমকে যান স্টেশন মাস্টার। একসঙ্গে এত টাকার টিকিট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় বিষয়টি জানানো হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। মফিজুল দমে যাননি। এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে আবারও হাজির হন স্টেশনে।

অবশেষে গত ১ এপ্রিল রেলওয়ের বিশেষ রশিদের (মানি রিসিট) মাধ্যমে তিনি সেই ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে দীর্ঘ ৪৮ বছরের এক মানসিক বোঝা নামালেন।

"এখন আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারব। রাষ্ট্রের কাছে আমার আর কোনো দায় রইল না।" — স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলছিলেন মফিজুল ইসলাম।

শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. সাইদুর রহমান মফিজুল ইসলামের এই মহানুভবতায় মুগ্ধ। তিনি জানান, গত ৬ এপ্রিল সেই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

স্টেশন মাস্টার বলেন, "মানুষের সব সময় একরকম বোধোদয় থাকে না। কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি যেভাবে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। যারা প্রতিনিয়ত টিকিট ফাঁকি দেন, তাদের জন্য মফিজ সাহেব এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।"

Link copied!