আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষে (২০২৭) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বিষয় চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণিতে দুটি এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আরও দুটি বাধ্যতামূলক বিষয় যুক্ত হবে।
আজ সোমবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় পর্যায়ের স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম, প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসব তথ্য জানান।
শিক্ষা ব্যবস্থার চলমান সংস্কার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজ চলছে। আগামী বছর শিক্ষাক্রমে চারটি নতুন বিষয় যুক্ত করা হবে। প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও প্রস্তুতি শেষে ২০২৮ সাল থেকে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা ও কর্মমুখী করার লক্ষ্যে এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এআইভিত্তিক মৌখিক পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় ৫৩ হাজার প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে সারাদেশে শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ১৫০।
তিনি জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে এআইভিত্তিক ভাইভা পদ্ধতি চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে পক্ষপাত, প্রভাব বা অনিয়মের সুযোগ থাকবে না।
তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা না গেলে প্রচলিত পদ্ধতিতেই ভাইভা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
শিক্ষা খাতের দুর্নীতি নিয়ে আসছে শ্বেতপত্র
শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে সংঘটিত দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রস্তুত করা হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হবে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য ১,৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ
সংবাদ সম্মেলনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবসর সুবিধা না পাওয়া শিক্ষকদের জন্য এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থ সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিক্ষক তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। জুন বা জুলাইয়ের মধ্যেই এ অর্থ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে বলে।
সময়মতো পাঠ্যপুস্তক বিতরণে প্রস্তুতি
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দিতে মুদ্রণ ও বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বইয়ের ছাপার কাজের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জানুয়ারির শুরুতেই শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ
শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণে দীর্ঘদিন পর নতুন নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান সচিব আব্দুল খালেক। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণে নতুন ভবন নির্মাণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের জন্য বৃহৎ পরিসরে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী।