প্রকাশিত: মার্চ ২৪, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা অনুদান দেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে। এ অনুদানেই যাত্রা শুরু করেছিল ফাউন্ডেশন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অনুদানের মোট ১১৯ কোটি টাকার মধ্যে ফাউন্ডেশনের হাতে আছে ৪ কোটি ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
১০০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার পর ওই দিন রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারকে দেখাশোনার যে দায়িত্ব সরকার নিয়েছে, তা এই ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে আহত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসহ অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করবে এই ফাউন্ডেশন। যাত্রা শুরুর পর ফাউন্ডেশনের এ তহবিলে ৫ কোটি টাকা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫ কোটি টাকা দিয়েছিলেন নাম প্রকাশ না করা এক নারী। ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট ও ফেসবুকে এবং আরও কিছু জায়গা থেকেও অনুদান পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের বেতন, ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস ভাড়া, যানবাহন কেনা, ভাড়া করা, মেরামত, জ্বালানি, ভ্রমণ ব্যয়, আসবাবপত্র কেনাসহ আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আবর্তক ব্যয় খাতের অবস্থা আরও শোচনীয়। ফাউন্ডেশন থেকে জানানো আছে, এ খাতে সরকারের বরাদ্দ করা ৩ কোটি টাকার মধ্যে যা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে চলতি মার্চ মাসে কর্মীদের বেতন-বোনাসসহ অন্যান্য খরচ চালানো যাবে।
অনুদানের মোট ১১৯ কোটি টাকার মধ্যে ফাউন্ডেশনের হাতে আছে এখন ৪ কোটি ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। ফাউন্ডেশন পরিচালনায় সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ৩ কোটি টাকার মধ্যে যা আছে, তা দিয়ে চলতি মার্চ মাসে কর্মীদের বেতন-বোনাসসহ অন্যান্য খরচ চালানো যাবে।
ফাউন্ডেশনের নিয়ম অনুযায়ী, অনুদানের টাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয় করা যাবে না। অনুদান ও আবর্তক ব্যয় খাত—এই দুই তহবিলেই টাকা না থাকায় ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফাউন্ডেশনের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা।
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবর্তক খাতে অনুদান চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠায় ফাউন্ডেশন। এতে আবর্তক খাতের বেতন-ভাতা ছাড়াও অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের আপত্কালীন এবং জরুরি সহায়তা দিতে ৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি ফাউন্ডেশন।
এর আগে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আট মাসের জন্য (২০২৪ নভেম্বর থেকে ২০২৫ জুন) আবর্তক ব্যয় খাতে মোট ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল ফাউন্ডেশন।
শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত ব্যক্তিরা শেষ ভরসা হিসেবে ফাউন্ডেশনে এসে হাজির হন। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আহতদের হাসপাতালগুলোয় বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা। অনেকেই তা পাচ্ছেন না।
কামাল আকবর, সিইও, জুলাই ফাউন্ডেশন
ফাউন্ডেশন পরিচালনা বা চলার মতো টাকা না থাকলেও আবর্তক খাতের ৩ কোটি টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আহতদের অস্ত্রোপচার, যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, শিক্ষাসহায়তা দেওয়া, ওষুধ কেনা, হুইলচেয়ার কেনা, ফিজিওথেরাপি করানো, আন্দোলনে শহীদদের মায়েদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয় বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত ব্যক্তিরা শেষ ভরসা হিসেবে ফাউন্ডেশনে এসে হাজির হন। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালগুলোতে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা। অনেকেই তা পাচ্ছেন না।
ফাউন্ডেশনের আবাসন, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৫ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজে ব্যবসা করতে চান বলে জানিয়েছেন। ফাউন্ডেশন শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত ৯৪টি পরিবারকে দোকান করে দেওয়া, খামার করে দেওয়া, অটোরিকশা কিনে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে পুনর্বাসন করেছে। একেকটি পরিবার গড়ে দেড় লাখ টাকা করে পেয়েছে।
বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ভুক্তভোগীরা ফাউন্ডেশনে আসেন। ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে দেখেন। তারপর ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবককে দিয়ে ওই ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাঠানো হয়। নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করাতে হয়। বাড়ি যাওয়ার জন্য যানবাহন ঠিক করে দিতে হয়। বাড়ি যেতে না পারলে কোথায় রাত কাটাবেন, সে ব্যবস্থাও করতে হয়। এ কাজগুলো ফাউন্ডেশন দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে করছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ৪ মার্চ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনকে আর্থিক অনুদান দেওয়া প্রসঙ্গে একটি চিঠি পাঠায়। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ২৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল।
ফাউন্ডেশনে এখন কাজ কমে গেছে। ভুক্তভোগীরা আর্থিক সহায়তার জন্য এসে টাকা নেই বলে ফিরে যান। সরকারকে এদিকটিতে নজর দিতে হবে।
গোলাম রহমান, শহীদ গোলাম নাফিজের বাবা
ফিরতি চিঠিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসা অনুদান বাবদ অর্থ বিভাগ মন্ত্রণালয়ের চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৫০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সেই টাকা কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে বা হবে, তা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে আরও ১০০ কোটি টাকা অর্থ প্রয়োজন। এ অবস্থায় ফাউন্ডেশন যে বরাদ্দ চেয়েছে, তা দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ নেই।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বাজেট) মু. আসাদুজ্জামানের সই করা এ চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারি বিধি অনুযায়ী, সরকারের বিধিবদ্ধ/নিবন্ধিত বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরকারি রাজস্ব বাজেট থেকে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ফাউন্ডেশনের অনুকূলে সরাসরি নগদ অর্থসহায়তা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর বলেন, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এনজিওবিষয়ক ব্যুরো এবং একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে জুলাই ফাউন্ডেশনের নিবন্ধন হয়। তাই ফাউন্ডেশন নিবন্ধিত না, তা বলার সুযোগ নেই। আর ফাউন্ডেশন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে কাজগুলো করার কথা ছিল, সেই কাজগুলোই করছে। সরকার তো লাশ সৎকারের জন্যও টাকা দিচ্ছে, তেমনই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরকার এ ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নেবে।
ফাউন্ডেশনের যত উদ্যোগ
ফাউন্ডেশনের আবাসন, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৫ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজে ব্যবসা করতে চান বলে জানিয়েছেন।
ফাউন্ডেশন বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় এ পর্যন্ত শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত ৯৪টি পরিবারকে দোকান করে দেওয়া, খামার করে দেওয়া, অটোরিকশা কিনে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে পুনর্বাসন করেছে। একেকটি পরিবার গড়ে দেড় লাখ টাকা করে পেয়েছে বলে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, বিকেএসপি, এসএমই ফাউন্ডেশন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ফাউন্ডেশন শুরু থেকেই শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই, ডেটাবেজ তৈরির কাজটি করছে। অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্ত করতেও সম্পৃক্ত এ ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনে এসে ভুয়া শহীদ এবং আহত হিসেবে চিহ্নিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কাজটিও করছে। ফাউন্ডেশনে আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন আবেদনগুলোকে ডিজিটাল নথিভুক্ত করার কাজ শুরু করেছে।
ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য বলছে, অনুদানের ১১৯ কোটি টাকা থেকে এ পর্যন্ত গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জনের মধ্যে ৮২২ জন শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। একেক শহীদ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ৮২২ জনের মধ্যে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত পাঁচ শহীদ পরিবারকে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
গেজেটভুক্ত আহতদের মধ্যে এ ও বি ক্যাটাগরিভুক্ত (অঙ্গহানিসহ গুরুতর আহত) সাড়ে ৬ হাজার জন আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। আহত প্রত্যেক ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং ক্ষতি অনুযায়ী জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল ফাউন্ডেশনের। তবে ৮ হাজার ২০০ জন এখন পর্যন্ত ১ টাকাও আর্থিক সহায়তা পাননি। এর মধ্যে ২ হাজার জন অঙ্গ হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিও রয়েছেন।
ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর বলেন, যাঁরা এখন পর্যন্ত ফাউন্ডেশন থেকে ১ টাকাও আর্থিক সহায়তা পাননি তাঁরা বলতেই পারেন এমন ফাউন্ডেশন থাকার কোনো দরকার নেই। এই মানুষদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্যই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে ২৩৮ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
কোনো কোনো আহত ব্যক্তি দ্বিতীয় দফায়ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। যাঁরা কোনো সহায়তা পাননি, তাঁরা এটা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গত বছরের ৮ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অফিস ভাঙচুর করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের কয়েকজন। গত বছরের ১৩ মে ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের সামনে ফাউন্ডেশনের সিইও এবং কোষাধ্যক্ষের অপসারণ দাবি করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা।
ফাউন্ডেশনে কর্মরতরা বলছেন, আহতদের ধরন অনুযায়ী কেউ কেউ দ্বিতীয় দফায় সহায়তা পেয়েছেন।
গত ৯ মার্চ দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, লাইলী বেগম এসেছেন তাঁর ছেলে আলীফ আল হাসানের নাম জুলাই যোদ্ধা হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না, সে কথা জানানোর জন্য। মাদারীপুরে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া আলীফ গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।
যাত্রাবাড়ীর মো. জামাল হোসেন হাতে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি ফাউন্ডেশন থেকে দুই লাখ টাকা পেয়েছেন। আরও দুই লাখ টাকার জন্য আবেদন করেছেন বলে জানালেন।
কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন শাকিল আহমেদ ও জাহাঙ্গীর আলম। তাঁরা গেজেটে সি ক্যাটাগরির আহত যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আট মাস আগে আর্থিক সহায়তা চেয়ে আবেদন করলেও এখনো কোনো সহায়তা পাননি ফাউন্ডেশন থেকে। কবে পাবেন, তা–ও জানেন না। কুষ্টিয়া থেকে এ পর্যন্ত চারবার ফাউন্ডেশনে এসে যোগাযোগ করেছেন বলে জানালেন।

নানা তথ্য জানতে ৯ মার্চ তাঁরা এসেছিলেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনেছবি: মানসুরা হোসাইন
পেশায় রিকশাচালক শাকিল আহমেদ বলেন, এখানে এলে কেউ খারাপ ব্যবহার করেন না। হাসি মুখে কথা বলেন। কিন্তু তারপর কর্মরত ব্যক্তিরা বলেন, ফাউন্ডেশনের টাকা নেই। যাত্রাবাড়ীর আরেক আহত যোদ্ধা ইয়াসিন আরাফাত তাঁর পরিচিত শাকিল ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে এসেছেন ফাউন্ডেশনে। তাঁর বুকে গুলি লেগেছিল। তিনি অবশ্য ফাউন্ডেশন থেকে তিন লাখ টাকা পেয়েছেন বলে জানালেন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ১৭ বছর বয়সী গোলাম নাফিজ শহীদ হয়। নাফিজের বাবা গোলাম রহমান গত বছরের ১ মার্চ থেকে ফাউন্ডেশনের ফ্রন্টডেস্কে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিসহ আরও কয়েকটি শহীদ পরিবারের সদস্য ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন বলে তাঁর কাছে জানা গেল।
গোলাম রহমান বলেন, ফাউন্ডেশনে এখন কাজ কমে গেছে। ভুক্তভোগীরা আর্থিক সহায়তার জন্য এসে টাকা নেই বলে ফিরে যান। সরকারকে এ দিকটিতে নজর দিতে হবে।
ফাউন্ডেশনকে ঘিরে জটিলতা
সরকার অনুমোদিত অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবামূলক ও জনকল্যাণমূলক বেসরকারি সংস্থা হিসেবে ফাউন্ডেশন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি এবং জুলাই শহীদ মীর মাহমুদুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধকে সাধারণ সম্পাদক করে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়। মীর মাহবুবুর রহমান পরে ফাউন্ডেশনের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের ৮ মে তিনি পদত্যাগ করেন। সেদিনই নতুন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন কামাল আকবর।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদসহ বিভিন্ন কমিটি পুনর্গঠিত হয়নি।
এর আগে গত বছর ২৩ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন যাত্রা শুরু করে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’। এ অধিদপ্তরের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা, ভাতা দেওয়া, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসহায়তা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ, পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। ফাউন্ডেশনও প্রায় একই ধরনের কাজ করছে। ফলে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ঝামেলা হচ্ছে বলে জানালেন ফাউন্ডেশনে কর্মরত ব্যক্তিরা।
আবার ফাউন্ডেশনে নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কর্মরত একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয়েছে। এটা নিয়ে রেষারেষিও রয়েছে।
ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর এ বিষয়ে বলেন, ফাউন্ডেশনের শুরুতে অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে যে অভিযোগ, তা একেবারে অসত্য নয়। তবে তখনকার দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে এ ছাড়া হয়তো অন্য উপায়ও ছিল না।
ফাউন্ডেশন থাকবে কি থাকবে না—এমন চিন্তায় ফাউন্ডেশনের কর্মীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে জানিয়ে কামাল আকবর বলেন, হুট করে সরকার এ ফাউন্ডেশনকে বন্ধ করে দিতে পারবে না। বিষয়টি নিয়ে কর্মীদের প্রতিনিয়ত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালে রাজধানীর ফকিরেরপুল পানির ট্যাংকের কাছে ছয় কাঠা জমি ফাউন্ডেশনের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয় জানিয়ে কামাল আকবর বলেন, এ জমিতে নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা হলে ফাউন্ডেশনের দৈন্যদশার অবসান ঘটবে।
আপনার মতামত লিখুন :