দেশে হাম প্রতিরোধে টিকার জোগান বাড়ানো হচ্ছে। চালু আছে জরুরি টিকাদান কর্মসূচিও। তার পরও সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর হার থামছে না। গত ৫২ দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন টিকার চালান আসার পাশাপাশি সাপ্তাহিক সরবরাহও অব্যাহত থাকবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা নয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
গতকাল বুধবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউনিসেফের পাঠানো হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার চালান গ্রহণ শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, এক চালানে ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকা দেশে এসেছে। পাশাপাশি এসেছে ৯ হাজার টিডি-টিটাস টিকা। তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে নতুন টিকার চালান দেশে পৌঁছাবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১০টি রোগ প্রতিরোধে আগামী রোববার প্রায় ১ দশমিক ৮ কোটি ডোজ টিকা দেশে আসবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইউনিসেফের মাধ্যমে ১০ ধরনের মোট ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ সম্পন্ন হবে।
পোলিও নির্মূলে সরকার দুই ধরনের টিকা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে মুখে খাওয়ার জন্য ওপিভি এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে আইপিভি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিশুদের নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে পিসিভি দেওয়া হচ্ছে। হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে এমআর টিকা। তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে টাইফয়েড প্রতিরোধে দেওয়া হচ্ছে টিসিভি টিকা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ চলমান রয়েছে। ৫ মে পর্যন্ত এক কোটি ৬৮ লাখের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ শতাংশ।
মৃত্যু ও সংক্রমণ থামছে না
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে, দুজন হামে মারা গেছে। এ নিয়ে গত ৫২ দিনে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩২৪। এর মধ্যে ২৬৮ শিশু উপসর্গ নিয়ে এবং ৫৬ জন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। একই সময়ে দেশের আট বিভাগে এক হাজার ৫৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। নতুন শনাক্ত হয়েছে ৩৭৩ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সিলেট বিভাগে (১৮২ জন), এরপর ঢাকা বিভাগে (১২২ জন)। তবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৮৫৫ শিশু চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে, যা কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৪৪ হাজার ২৬০ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার জোগান বাড়ানো ইতিবাচক হলেও তা যথেষ্ট নয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বিশেষ নজর না দিলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, দ্রুত টিকাদানের পাশাপাশি রোগী শনাক্ত করে আলাদা রাখা, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
হাসপাতালে চাপ ও আইসিইউ সংকট
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা থামছে না। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে চার মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। দেড় মাসে এ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে ২৬ শিশুর।
১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার ১০৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার চারজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে; চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৫ শিশু। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ৬৪ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি রাখতে হচ্ছে, অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশুটির বাবার অভিযোগ, আইসিইউ বেড না পাওয়ায় তাঁর সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশুটি নিউমোনিয়া, মৃগী রোগসহ জটিলতায় ভুগছিল।
রাজশাহীতেও বাড়ছে মৃত্যু
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৭৬। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত ৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মৃতদের বেশির ভাগই টিকাবঞ্চিত এবং পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে এ পর্যন্ত চার হাজার ৪২৫ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৬১৬ শিশু সুস্থ হয়েছে এবং ৫১৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
সিলেটে সপ্তাহে চারজনের মৃত্যু
সিলেটে হাম ও রুবেলা রোগে মৃত্যু বাড়ছে। এক সপ্তাহে মারা গেছে চার শিশু। এ নিয়ে সিলেটে ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে ওসমানী হাসপাতালে হামে মারা যায় রায়হান নামের শিশু। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজনের হাম শনাক্ত হয়েছে।