সারা দেশে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কয়েক বার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি বলেছেন। এরপর চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়ায় গত রবিবার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করে পুলিশ। যদিও আটকের ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। তবুও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে এর মাধ্যমে একটা বার্তা দেওয়া গেছে বলে মনে করছেন সরকারের দায়িত্বশীলরা।
সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে অভিযান শুরু করেছে। ইতিমধ্যে সারা দেশে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করে ‘অলআউট’ অ্যাকশনে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাঁড়াশি অভিযানে গত মঙ্গলবারও ১৭৩ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তাদের মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ রয়েছে ৩৫ জন। তালিকার বাইরে ৪৮ জনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী ও ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬৪ জনকে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী ১ মে থেকে শুরু হওয়া অভিযানে পাঁচ দিনে ৫৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, তদবিরে কোনো চাঁদাবাজকে ছাড়া হবে না। তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সে অনুযায়ী গ্রেপ্তার অভিযান চলবে। এখানে চাঁদাবাজদের অন্য কোনো পরিচয় দেখা হবে না। তিনি বলেন, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ছাড়াতে কেউ তদবির করলে ধরে নেওয়া হবে সেও চক্রের সঙ্গে জড়িত। চাঁদাবাজ যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে পুলিশ কঠোর অবস্থানে।
জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি মহানগর এলাকা, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ইউনিটকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজির মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী সে যে দলেরই হোক, যত বড় নেতাই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা যৌথ অভিযান চালাচ্ছি। গত ১ মে থেকে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। এবার যে কোনো মূল্যে দেশকে চাঁদাবাজ মুক্ত করা হবে। এ নিয়ে যে দুর্নাম রয়েছে তা থেকে এবার উত্তরণের চিন্তা সরকারের।
চাঁদাবাজদের নিয়ে র্যাবের তৈরি করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে চাঁদাবাজদের গডফাদার রয়েছে ৬৫০ জন। এসব গডফাদারের অধিকাংশেরই রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়, যা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলার প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ। এই তালিকায় প্রায় ৪ হাজার চাঁদাবাজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে অভিযানে নতুন নতুন নাম আসছে।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটকের মধ্য দিয়ে সরকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটা বার্তা দিতে চেয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা ঘেরাও করলেও পুলিশ তাকে ছাড়েনি। নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিক্ষোভ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে কুমিল্লার অন্যতম বৃহত্ শাসনগাছা বাস টার্মিনালের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে গত মাসে রাজধানীর শ্যামলীতে কামরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠিত সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে যুবদল নেতার পরিচয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে এই ঘটনায় হাসপাতালটির অস্ত্রোপচারের কক্ষের ইনচার্জ আবু হানিফ শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলার পর র্যাব ১ নম্বর আসামি মঈন উদ্দিন ও তার ছয় সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। তারা যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এদিকে ঢাকার মিরপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা চাঁদাবাজির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। রাজধানীর এই এলাকায় দেড় শতাধিক চাঁদাবাজির স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সংগঠিতভাবে দোকান, ফুটপাত, পরিবহন ও বিভিন্ন ব্যবসা খাত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে ৭২ জন সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং অন্তত ২৫ জন ব্যক্তি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালীরাও রয়েছেন।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত পুরো এলাকা, পাশাপাশি মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, রূপনগর, শাহ আলী ও ভাষানটেক থানার বিভিন্ন অংশে চাঁদাবাজির বিস্তার রয়েছে। রাস্তার দুই পাশে ফুটপাত দখল করে শত শত দোকান বসানো হয়, যেগুলো থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানের অবস্থান ও আকারভেদে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এই টাকা সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা ‘লাইনম্যান’ হিসেবে কাজ করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর সেকশনের এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ দোকান ফুটপাত ও সড়ক দখল করে পরিচালিত হচ্ছে। এসব দোকান থেকে দৈনিক গড়ে ২০০ টাকা করে চাঁদা ধরা হলে মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় হয়। এই অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, সন্ত্রাসী চক্র এবং কিছু প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।