ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

হামে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, কী করছে সরকার

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম

হামে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, কী করছে সরকার

ছবি:সংগৃহীত

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এখনও পর্যন্ত ৪৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং ৩৮৯টি মৃত্যু হাম সন্দেহে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত হয়ে বাড়ছে মৃত্যু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হামের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং হামে মৃত্যুর পেছনে কারণ খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে হাম প্রতিরোধে সরকার কী করছে, কী উদ্যোগ নিয়েছে— এ নিয়েও জনমনে প্রশ্ন আছে।

সরকারের পরিকল্পনা ইমিউনিটি বাড়ানোর দিকে এবং সব শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার। সরকার মনে করে, ইমিউনিটি বাড়িয়ে টিকার মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সেদিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে প্রশ্ন উঠে টিকা নিয়ে

দেশে দীর্ঘদিন হামের টিকা ক্যাম্পেইন হয়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের দিকে হামের টিকা ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়। চার বছর পর পর এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও দেশে অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালে এবং পরবর্তীকালে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতিতে টিকার প্রচারণা হয়নি বলে বলে মনে করে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, হাম ও রুবেলা ভ্যাকসিনের ক্যাম্পেইন চার বছর পর পর হয়। একটা ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, আরেকটা ২০২১ সালের জানুয়ারির দিকে। তখন ছিল কোভিডকালীন সময় এবং আমরা যে ডেটাগুলো দেখছি—  সে সময় যে সরকার দায়িত্বে ছিল, তারা ডেটা টেম্পারিংয়ে সাংঘাতিক ওস্তাদ ছিল। বিভিন্ন রকম ডেটা টেম্পারিং তারা করেছে। ওই সময় হামের কাভারেজের যে ডেটা— আমি অন্তত এটুকু বলতে পারি, এটা সঠিক না। তখন হামের কাভারেজ যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, সেটা হয়নি। ইনকমপ্লিট কাভারেজের চার বছর পর যে আরেকটা টিকা রাউন্ড, সেটা হওয়ার কথা ছিল ২০২৪-২৫ সালে। বিভিন্ন কারণে সরকারের দুর্বলতা, তাদের অদক্ষতার কারণে সেই টিকার ক্যাম্পেইন একেবারেই হয়নি। এ কারণে আজ আমরা এই ডিজাস্টারের মধ্যে জাতিগতভাবে পড়েছি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, প্রত্যেক বছর দুবার ভিটামিন ‘এ’ এর ক্যাম্পেইন করার কথা। গত বছরের প্রথমার্ধে একটা ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হয়েছিল। তারপরে কোনও ক্যাম্পেইন হয়নি এবং ভিটামিন এ নাই।

তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনও মজুত ছিল না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং টিকার তীব্র ঘাটতি বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ বলেও জানান তিনি। 

টিকা কেনা নিয়ে জটিলতা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে অচলাবস্থা তৈরি হয় টিকা কেনায়। কারণ এসব টিকা অতীতে কেনা হতো সেক্টর কর্মসূচির আওতায় অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে। কিন্তু তখনকার সরকারের অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত টেন্ডারে এবং বাকি অর্ধেক ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্তে জটিলতা তৈরি হয়। যদিও পরবর্তীকালে পুরো টিকাই ইউনিসেফের কাছ থেকে কেনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার পদ্ধতি নিয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছে ইউনিসেফ।

লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত টিকা দিয়েছে সরকার

হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকা কিনে হামের টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে। এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার কথা থাকলেও গত ৫ এপ্রিল থেকে রবিবার (১৭ মে) পর্যন্ত ১ কোটি ৮২ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ জনকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। যারা বাদ পড়েছে তাদেরকে প্রচারণার মাধ্যমে টিকা নিতে কেন্দ্রে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘টিকা ব্যবস্থাপনায় কোনও ভুল বা অব্যবস্থাপনা হয়ে থাকলে তা তদন্ত করা হবে কিনা, সে বিষয়ে সংকট কাটার পর কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দোষী ব্যক্তি নির্ধারণের চেয়ে এই মুহূর্তে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকেই সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’’

শিশুদের পুষ্টিতে জোর

হামে এত শিশুর মৃত্যুতে পুষ্টিহীনতা একটা কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হামে আক্রান্ত শিশুদের মায়েরা বেশিরভাগ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন এবং পুষ্টির ঘাটতি হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এ কারণে শিশুরা হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের সঠিকভাবে আইসোলেশন করতে না পারায় এর মাত্রা বেড়েছে। নানা সমস্যার কারণে হাম এবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জর্জরিত করেছে।

‘২০২০ সালের পর দেশে হামের কোনও টিকা দেওয়া হয়নি’ উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চলতি বছরই সরকার দায়িত্ব নিয়ে শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসছে। চলমান হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এ সপ্তাহের মধ্যে ইউনিসেফ থেকে এক কোটি ভিটামিন এ ক্যাপসুল পাবে বাংলাদেশ।তিনি বলেন, ‘‘পুষ্টির ব্যাপারে দায়িত্ববোধ বাড়ালেই হামসহ সব ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।’’ 

সংক্রমণ কমছে হটস্পট ৩০ জেলায়

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ প্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতারের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস বলেন, ‘‘ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা দেখাতে সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ৩০ উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম চালুর পর বর্তমানে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষ করে ১৭ এপ্রিলের পর থেকে ওইসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমতে শুরু করেছে। এই ফলাফল টিকাদানের কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ। একই প্রবণতা ৫টি সিটি করপোরেশন এলাকায়ও দেখা যাচ্ছে।’’

সারা দেশে শিশুদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণ হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। সেজন্য আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে হামের প্রকোপ কমে যাওয়ার আশা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক বলেন, ‘‘হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একসময় সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে এর সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু গত দুই বছরে টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।’’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘‘৬ মাস থেকে ৯ মাস পর্যন্ত মায়ের ব্রেস্ট ফিডিং এ যেটা পায় ওটা দিয়ে ‘ইমিউনিটি’ চলে। তাহলে এখন ৬ মাস থেকে ৯ মাসের এত বাচ্চা, ‘ম্যাক্সিমাম’ বাচ্চার কেন হাম হচ্ছে? যেটা আমি আলাপ এবং অভিজ্ঞতা থেকে পাচ্ছি, পুষ্টির অভাব। পুষ্টির অভাব এই হাম থেকে ম্যাক্সিমাম রোগী নিউমোনিয়াতে চলে যাচ্ছে।

Link copied!