শ্রমিক বিক্ষোভের ষষ্ঠ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সকালে পোশাক তৈরির শতাধিক কারখানার শ্রমিকরা হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল থেকে বের হয়ে যান। এর পর রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও ঢাকার মিরপুরে গতকাল পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গতকাল মোতায়েন ছিল ৩৩ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে কিছুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এরই মধ্যে নতুন মজুরি বোর্ডের বৈঠক হয়েছে।
এদিকে, আগামীকাল শনিবার তৈরি পোশাক খাতের সব কারখানায় ছুটি থাকবে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে কারখানা বন্ধ রাখতে সদস্যভুক্ত কারখানা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধ রাখতে চান মালিকরা
চলমান অস্থিরতা নিয়ে গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের একটি প্রতিনিধি দল। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠকে ১ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়। এ সময় পোশাকশিল্পের মালিকরা জানান, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তারা শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ ভিত্তিতে কারখানা বন্ধ রাখতে চান।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শিল্পমালিকদের প্রতি অনুরোধ করেন।
এখনও স্বাভাবিক হয়নি আশুলিয়া
শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে গতকাল আশুলিয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। সকাল ৮টায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে গেলেও প্রথমে নিট এশিয়া ও আল-মুসলিম কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষে আহত হয়ে পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেন শেখের মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়ার জিরাব এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক মিছিলে অংশ নেন।
শ্রমিক আন্দোলনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়ায় এ পর্যন্ত আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আশুলিয়ায় পরিস্থিতির কারণে অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিছু কারখানা আগে থেকেই নোটিশ দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
শিল্পাঞ্চল-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গতকাল আশুলিয়া এলাকায় বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিকরা হাজিরা দিয়ে বের হয়ে যান। এর মধ্যে আছে নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন, নিউ এইজ, হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, ডেকো গার্মেন্টস, বেঙ্গল গ্রুপ ও সাদিয়া ফ্যাশন, পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেড, আর্টিস্টিক ডিজাইন লিমিটেড, জনরন সোয়েটার লিমিটেড, ফেরারী গার্মেন্টস লিমিটেড, ডেনিটেক্স লিমিটেড, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড, আল ইসলাম টেক্সটাইল লিমিটেড, জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ, মিলিনিয়াম টেক্সটাইল লিমিটেড, হেসং কোরিয়া লিমিটেড, কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টস লিমিটেড, টেক্সটাউন গ্রুপ, আফিয়া নিটওয়্যার লিমিটেড, নাঈম নিটওয়্যার লিমিটেড, জিহান গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, লেদারেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড, এভারব্রাইট সোয়েটার লিমিটেড, গ্রিন লাইফ নিটেক্স লিমিটেড, ফোরাম লিমিটেড, সাফা সোয়েটার, উঁচু ফ্যাশন, দিপস অ্যাপারেলস, এফএনএফ অ্যান্ড ট্রেড ফ্যাশন, ফ্যাশন ইট কোম্পানি ও আয়েশা ক্লোথিং (পলমল গ্রুপ)।
শিল্প পুলিশ আশুলিয়া জোনের পুলিশ সুপার (এসপি) মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্প পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কর্মস্থলে ফিরছেন অধিকাংশ শ্রমিক
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিনের অস্থিরতা কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে পরিস্থিতি। কর্মস্থলে ফিরেছেন অধিকাংশ কারখানার শ্রমিক। শ্রমিকদের উপস্থিতিতে ফিরতে শুরু করেছে কর্মচাঞ্চল্য।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মাঠে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গতকাল সকাল ১০টার দিকে গাছা এলাকায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা জড়ো হয়ে মহাসড়কে নামার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, গতকাল জেলা ও মহানগরে সাতটি শিল্পকারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের পর গতকাল পরিস্থিতি শান্ত ছিল। সকাল থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। সব কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন হয়েছে। তবে অসন্তোষের আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চাষাঢ়া, শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল, রিয়া গোপ স্টেডিয়াম, ভুঁইঘর, জালকুড়ি, সাইনবোর্ড, কাঁচপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাঁজোয়া যান নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন।
৩৩ প্লাটুন বিজিবি
শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পোশাক কারখানাসহ শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবি জানায়, মোতায়েন করা সদস্যদের মধ্যে মিরপুরে ৩ প্লাটুন, সাভার ও আশুলিয়ায় ১১ প্লাটুন, গাজীপুরে ১২ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জে ৭ প্লাটুন দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদারে আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি) ও রায়ট কন্ট্রোল ভেহিক্যাল (আরসিভি) মোতায়েন রয়েছে।
নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে ড্রোনের মাধ্যমে সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় বডি ওর্ন ক্যামেরা ও ইম্প্রোভাইজড বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করছেন বিজিবি সদস্যরা। বিজিবি সদরদপ্তরের মনিটরিং সেল থেকে এসব কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিজিবি সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট এলাকার সার্বিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবির এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
শ্রমিকদের দাবিতে জামায়াতের সমর্থন
শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে ন্যায্য আখ্যা দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি শ্রমিক হত্যার বিচার, মূল্যস্ফীতি এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় অনুযায়ী মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করা, গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তিসহ ১৫ দাবি জানিয়েছে। তবে জামায়াত আন্দোলনে ভাঙচুর, আগুন ও লুটের নিন্দা করেছে।
গতকাল রাজধানীর মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, জানুয়ারি থেকে বর্ধিত মজুরি কার্যকর করতে হবে। গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক শেখ হত্যার বিচার করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহত শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।সংবাদ বিশ্লেষণ টুল
তৌফিকের পরিবারের পাশে জামায়াত আমির
নিহত শ্রমিক তৌফিকের স্ত্রী এবং ভাইয়ের সঙ্গে গতকাল টেলিফোনে কথা বলেছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। এর পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, মাথা গোঁজার জমি পর্যন্ত নেই তাদের। তৌফিকের চাচার ছোট্ট একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন তৌফিকের স্ত্রী এবং ১১ মাস বয়সী সন্তান সিয়াম। এই পরিবারের পাশে থাকব।