প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ০৯:৩৮ এএম
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া নয়; এটি দুই থেকে তিন দশকের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, সংগ্রাম ও আত্মনিবেদনের ফসল। রাজনীতি তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার নাম নয়; এটি মানুষের আস্থা অর্জনের দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ এবং প্রায়শই কৃতজ্ঞতাহীন পথচলা।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে—মাঠে-ময়দানে সক্রিয় অংশগ্রহণ, জনগণের দুঃখ-দুর্দশায় সম্পৃক্ততা এবং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিজেকে শাণিত করার প্রক্রিয়ায়। একজন প্রকৃত নেতা কেবল বক্তৃতায় নয়, বরং দায়িত্ববোধ, ধারাবাহিকতা ও ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। পদবি সাময়িক; আস্থা স্থায়ী।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবরণ ও নেতৃত্ব, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন কিংবা অটল বিহারী বাজপেয়ীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যবসায়—সবই প্রমাণ করে, সময়ই প্রকৃত নেতৃত্বকে পরিপক্ব করে তোলে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামও উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রগঠনের প্রচেষ্টা তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁর জীবনাবসান—তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সঙ্গে আত্মত্যাগের অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দীর্ঘ সময় দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আন্দোলন, কারাবাস ও স্বাস্থ্যগত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলের নেতৃত্বে অবিচল ছিলেন—সমর্থকদের দৃষ্টিতে যা রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনও বিতর্ক ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থান, মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দলীয় কর্মকৌশলে সক্রিয় সম্পৃক্ততা—তাঁর অনুসারীদের কাছে তা আত্মত্যাগ ও অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
তবে রাজনীতির ময়দানে নায়কত্ব কেবল ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক আবেগে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়। একজন নেতার সার্থকতা নির্ধারিত হয় তাঁর নীতিগত অবস্থান, গণতান্ত্রিক চর্চা, জনগণের কল্যাণে বাস্তব অবদান এবং ইতিহাসের বিচারে।
বিনোদন জগতে জনপ্রিয়তা দ্রুত অর্জিত হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি আসে দীর্ঘ সময়ের বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। দুই-তিন দশকের নিরলস পরিশ্রম, ধৈর্য ও আত্মনিবেদন যখন মানুষের ভালোবাসায় রূপ নেয়, তখনই একজন নেতার রাজনৈতিক জীবন পূর্ণতা পায়। সেই সম্মান ক্ষণস্থায়ী করতালির চেয়ে গভীরতর—কারণ তা ইতিহাসের ধারায় স্থায়ী হয়ে থাকে।
অতএব, এ দেশে রাজনীতির মাঠে নায়ক হয়ে ওঠা কোনো বাহ্যিক চাকচিক্যের বিষয় নয়; এটি সময়, ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার সম্মিলিত যাত্রা। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই স্মরণে রাখে, যারা প্রতিকূলতার মাঝেও জনগণের আস্থা অর্জনে অবিচল থেকেছেন।
লেখক: মো: খালিদ সাইফুল্লাহ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আপনার মতামত লিখুন :