দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তারা এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। এক্ষেত্রে শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা এক বিশেষ জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিএসের ‘দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল’ পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, যেখানে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা।
পরিবারপ্রতি সবচেয়ে বেশি মাসিক গড় ব্যয় সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। এরপরে রয়েছে শহরাঞ্চলে গড়ে ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা ও গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
জাতীয় পর্যায়ে মাসিক খরচের অর্ধেক খাদ্যে এবং বাকি অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়, তবে অঞ্চলভেদে এর ভিন্নতা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যের পেছনে খরচ বেশি হয়, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে খাদ্যবহির্ভূত খাতে খরচ বেশি। সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে মাসিক খরচের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যবহির্ভূত খাতে।
এর বিপরীতে, ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দেখা গিয়েছিল, জাতীয় পর্যায়ে গড় পারিবারিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং গড় ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা।
নবম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ তৈরিতে সহায়তা করার লক্ষ্যেই কমিশন এই বিশেষ জরিপ পরিচালনা করতে বলেছিল।
গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এতে গ্রামীণ, শহরাঞ্চল ও সিটি করপোরেশন এলাকার মোট তিন হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ১৫০টি নমুনা এলাকা (স্যাম্পলিং ইউনিট) থেকে ট্যাবলেট ডিভাইস ও ডিজিটাল কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পার্সোনাল ইন্টারভিউয়িং পদ্ধতিতে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মহামারির পর থেকে বাংলাদেশ যে দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই জরিপের ফলাফল যেন তারই এক প্রতিচ্ছবি।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় (সিঙ্গেল ডিজিট বা ডাবল ডিজিট) রয়ে গেছে, যা কমার কোনো লক্ষণ নেই। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে আছে এবং মানুষের প্রকৃত মজুরি ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মজুরি হার সূচক’ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। এই সূচকের মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশার স্বল্প আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরির হিসাব রাখা হয়।
জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যেকোনো পরিবারকে তাদের অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলেই অনুমেয় উত্তরটি পাওয়া যাবে—আয় কমছে কিন্তু খরচ বাড়ছে। ফলে অনেকের সামনেই ঋণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই খরচ বৃদ্ধি কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে হচ্ছে না, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বা জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই হচ্ছে।
শহরের চেয়ে গ্রামে ঋণের বোঝা কেন বেশি—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, গ্রামে আয়ের ক্ষেত্রে স্থবিরতা প্রকট। অন্যদিকে শহরে তুলনামূলকভাবে কাজের বা অর্থনৈতিক সুযোগ কিছুটা বেশি থাকে।
তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও এর সুফল গ্রামের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায়। ফলে একটি বড় অংশের মানুষ এখন তাদের আগের জমানো সঞ্চয় ভেঙে কোনোমতে টিকে রয়েছে।
জাহিদ আরও বলেন, এই জরিপের তথ্য মূলত বিশ্বব্যাংকের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসেরই সত্যতা নিশ্চিত করে, যেখানে বলা হয়েছিল যে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে।
গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দা মানুষের জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো শ্রমের চাহিদায় ঘাটতি এবং টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর প্রভাবে দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
অর্থনীতির এই টানাপোড়েনের মূল কারণ হলো গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির লাগাতার বৃদ্ধি, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত সংকুচিত করে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তীব্র জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে ব্যবসার সময় কমাতে হয়েছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিশেষ করে শিল্প খাতে নতুন কোনো চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।