ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে দেওয়া যাবে না শাস্তি: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে দেওয়া যাবে না শাস্তি: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ যদি জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে অস্বীকার করেন, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এক মামলার শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ এই মৌখিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছে, কেউ বন্দে মাতরমের পুরোটা না গাইলে তা অপরাধ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

মোট ছয়টি স্তবক বন্দে মাতরমে। কিন্তু স্বাধীনতার আগে থেকেই সর্বত্র প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হয়ে আসছে। কারণ পরবর্তী স্তবকগুলোতে হিন্দু দেবী দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মুসলিম নেতারা এই গান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং পুরোটা গাইতে অস্বীকার করেছিলেন। তাই ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনের আগে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আজাদ ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথই প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই প্রথা কংগ্রেস আজও মেনে চলে।

এই গানের দেড়শ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিলে জাতীয় সংগীতের মতো বন্দে মাতরমকেও আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, কেউ যদি এই গান গাইতে বাধা দেন, না গান বা গাওয়ার সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, তাহলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। সাজা হতে পারে সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল, জরিমানা অথবা দুটোই। এই বিধানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা হয়েছে।

কর্ণাটকের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ এক রিট পিটিশন করে সরকারি নিয়ম ও শাস্তির বিধানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। মঙ্গলবার তার শুনানিতে প্রধান বিচারপতির এজলাসে ওই পর্যবেক্ষণ আসে। বিচারপতিরা বলেন, জাতীয় গানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আদালতের কাজ নয়। তবে কোনো নাগরিক যদি বিবেকের কারণে পুরো গান গাইতে না চান বা তাকে বাধ্য করা না হয়, সেটা আদালত খতিয়ে দেখতে পারে।

শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ১৯৮৬ সালের বিজোই ইমানুয়েল মামলার উল্লেখ করেন। তাতে ধর্মীয় কারণে কেরালার এক স্কুলে জাতীয় সংগীত গাইতে অসম্মত তিন পড়ুয়াকে সুপ্রিম কোর্ট রক্ষা করেছিল। রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংগীতের অপমান বা অসম্মানের অপরাধে যে শাস্তির বিধান আছে, শুধু না গাওয়ার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। মঙ্গলবার আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের অভিমত চেয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে বলেছে। যদিও সরকারকে এখনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।

শুনানির সময় সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা ও আবেদনকারীর আইনজীবী এস মুরলীধরের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। মুরলীধর বলেন, বন্দে মাতরমের শেষ চার স্তবকে হিন্দু দেবীদের বর্ণনা আছে। পুরো গান গাইতে বাধ্য করা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো জাতীয় ঐকমত্য ছাড়াই তড়িঘড়ি সংশোধনী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তুষার মেহতা জবাবে বলেন, সংবিধান অনুযায়ীই আইন প্রণয়ন হয়, নকশালপন্থীদের দাবি মেনে নয়। মুরলীধর এর প্রতিবাদ করে বলেন, স্বাধীনচেতা মানুষ মানেই নকশালপন্থী নয়। বিচারপতিরা হস্তক্ষেপ করেননি, তবে বলেছেন, এসব মন্তব্য নথিভুক্ত হবে না।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিধান থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস নেতারা দলীয় অনুষ্ঠানে এখনো পুরো গান গান না। ১৯৩৭ সালের প্রথা অনুযায়ী প্রথম দুই স্তবকই গাওয়া হয়। সম্প্রতি কর্ণাটক বিধানসভা ও বিধান পরিষদে শাসক দল কংগ্রেসের বিধায়কেরা প্রথম দুটি স্তবক গেয়ে থেমে যান। বিরোধীরা প্রতিবাদে পুরো গানটি গান। কংগ্রেস নেতারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, সরকার বলুক রবীন্দ্রনাথ, নেহরু, গান্ধী, সুভাষচন্দ্র ও সর্দার প্যাটেলরা অপরাধী বা দেশদ্রোহী!

জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সম্প্রতি এই বিষয়ে কংগ্রেসের দাবি মানতে অস্বীকার করেছেন। এক সরকারি অনুষ্ঠানে কংগ্রেস নেতারা প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার ওপর জোর দিলেও তিনি বলেন, রাজ্য সরকার আইন ভাঙতে পারে না। কংগ্রেসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় এসে আইন বদলে দিক। তা না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইন মেনে চলবেন। ওমর বলেন, ‘আমি চাই না কাশ্মীরিদের এ কারণে জেলে যেতে হোক।’

Link copied!