জেলা প্রশাসকরা যে গাড়ি ব্যবহার করেন, সেই মানের বাহন যদি ৩৫০ জন এমপিকে দেওয়া হয়, তাতে সরকারের খরচ হবে অন্তত ৫৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। জেলা প্রশাসকদের যে গাড়ি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটির দাম এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এমপিদের জন্য এর চেয়ে উন্নত গাড়ি কেনা হলে ব্যয় আরও বাড়বে। এর সঙ্গে চালক, জ্বালানি ও মেরামতের খরচ তো রয়েছেই।
বিদ্যমান নিয়মে এমপিরা মাসিক পরিবহন ভাতা হিসেবে ৭০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। এর সঙ্গে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা রয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, এমপিরা শুল্কমুক্ত গাড়ি কিনলে সরকার শুধু শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়। তবে নতুন গাড়ি এমপিদের কিনে দিয়ে নিয়মিত সেবা দেওয়া হলে সরকারের বড় অঙ্কের খরচ বাড়বে। জাতীয় সংসদে গত মঙ্গলবার এমপিদের জন্য সরকারিভাবে গাড়ির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছিলেন এনসিপির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, এমপিদের সরকারিভাবে গাড়ি দেওয়া হলে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ডিসি, ইউএনও, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা নির্দিষ্ট অফিস ও এলাকার জন্য সরকারি গাড়ি সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু এমপিদের কোনো অফিস নেই। তাদের প্রধান কাজ জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, সংশোধন, রাষ্ট্রীয় বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের কার্যাবলি তদারক করা। এখন তাদের সরকারি গাড়ি দিলে এই গাড়ি কোথায় ব্যবহার করবেন? নির্বাচনী এলাকায়, নাকি সারাদেশে?
এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিল হচ্ছে
জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ জন্য এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল এবং সংসদ সদস্যদের পারিতোষিক ও ভাতাদি আদেশ-১৯৭৩ সংশোধন করা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কক্ষে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংশোধনের জন্য এটি উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর তা সংসদে বিল আকারে উঠবে। সেখানে অনুমোদন পেলে সংশোধিত আদেশ গেজেট আকারে প্রকাশের পর এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা রহিত হয়ে যাবে।
সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেন, শুল্কমুক্ত সুবিধা রহিতকরণের জন্য সংসদ সদস্যদের পারিতোষিক ও ভাতাদি আদেশ-১৯৭৩ এর ৩-এর সি ধারা সংশোধন করা হচ্ছে। এরপর এমপিদের নতুন করে কী সুবিধা দেবে, সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে সে অনুযায়ী আমরা কাজ করব।
সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর তরফে সরকারি গাড়ি চাওয়া এবং তাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সমর্থনের পর বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এমপিরা যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা পাওয়ার পরও এমন চাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ফিরোজ মিয়া বলেন, শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাদ দিয়ে এমপিদের গাড়ি কিনে দিলে ব্যয় অনেক বাড়বে। এতে সরকার সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। গাড়িগুলো কোথায় চলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে। ফলে এমপিদের সরকারি গাড়ি না দিয়ে শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা দেওয়াই ভালো। তিনি বলেন, এমপিদের সরকারি গাড়ি দেওয়ার দৃষ্টান্ত বিশ্বের কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। আমার মনে হয় না, বর্তমান সংসদ সদস্যরা এমন অযৌক্তিক কাজ বাস্তবে করবেন। তারা হয়তো বলার জন্য এটা বলেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যরা যেহেতু শুল্কমুক্ত গাড়ির বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন, ফলে গাড়ি চাওয়াটা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের মতো যদি গাড়ি চাওয়া হয়, তাহলে বলতে হয়, নিজেদের সুবিধা বিবেচনায় সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তার পার্থক্য তারা বুঝতে চাচ্ছেন না।
ডিসি-ইউএনওর মতো গাড়ির কথা বলেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ
এমপির জন্য গাড়ি সুবিধা-সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে এ অভিযোগ করে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট নেবেন না– এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকর্তাদের যে প্রক্রিয়ায় গাড়ি দেওয়া হয়, সংসদ সদস্যদের একই প্রক্রিয়ায় গাড়ি দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি চাননি।
গতকাল সংসদে ফ্লোর নিয়ে ‘ব্যক্তিগত কৈফিয়ত’ দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, এখন গাড়ি রক্ষণাবেক্ষেণের জন্য ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের গাড়ি নেই। এর আগে গত মঙ্গলবার সংসদে দেওয়া বক্তব্যে এমপিদের জন্য সরকারি গাড়ির দাবি জানিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর ওই বক্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে– এমন অভিযোগ করে সংসদে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার পর সরকারি দল ও বিরোধী দল, উভয়ে একটা কমিটমেন্ট দিয়েছে। বহু দিনের প্রচলিত শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং প্লট আমরা নেব ন। গত মঙ্গলবার এ বিষয়টি সমর্থন জানানোর পাশাপাশি সংসদে একটা বক্তব্য দিই। যা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়াতে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ডসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা সরকারি কার্য পরিচালনার জন্য যেভাবে সরকারি একটি গাড়ি পেয়ে থাকেন, আমরা যারা সংসদ সদস্য আছি, তাদের জন্য ঠিক একই প্রক্রিয়ায় গাড়ি ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা, সেটি আমি সংসদে জানিয়েছিলাম।
হাসনাত বলেন, সরকারি মালিকানাধীন একটি গাড়ি, যতদিন এমপি থাকবেন ঠিক ততদিন ব্যবহার করবেন। সেটার জন্য অতিরিক্ত খরচও লাগবে না। সংসদ সদস্যের ইতোমধ্যে ৭০ হাজার টাকা গাড়ি মেইনটেন্যান্স করার জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের গাড়ি নেই। আমার যে বক্তব্য সেটা হচ্ছে, মঙ্গলবারের বক্তব্যে আমি ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি চাইনি।
গণমাধ্যম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, তাই আবার পুনরাবৃত্তি করছি উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, সব এমপির পক্ষ থেকে আমরা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি বা প্লটের সুবিধা না; অন্যান্য যে সরকারি সুবিধা আছে, সেটির মতো করে যতদিন এমপি থাকবে ঠিক ততদিন, এমপি শেষ, গাড়িটি আবার সরকার ফিরিয়ে নেবে।
স্পিকার বলেন, বিষয়টি এর আগে ক্লিয়ার (পরিষ্কার) করা হয়েছে। আমার মনে হয়, সংসদ সদস্যরা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি এবং প্লট না নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এতে দেশবাসী তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে।