ঢাকা রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩
amaderkhobor24.com

এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫% বেশি বৃষ্টি, মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ের আভাস

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫% বেশি বৃষ্টি, মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ের আভাস

সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে আবহাওয়ার ধরণকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৬৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অতিবৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকলেও কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

এ অবস্থায় চলতি মে মাসজুড়েও ঘূর্ণিঝড়, তীব্র কালবৈশাখী, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কৃষকদের জন্য দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মে মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলেও এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা থেকে একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মাসজুড়ে ৫ থেকে ৬টি কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে, যার মধ্যে ২ থেকে ৩টি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশে এপ্রিল সাধারণত সবচেয়ে উষ্ণ মাস হিসেবে পরিচিত। এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এবার সর্বোচ্চ ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় যথাক্রমে ০.৬ ডিগ্রি ও ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল। মাসজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি; বরং বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি অঞ্চলে স্বল্প সময়ের জন্য তাপপ্রবাহ হয়েছে।

২২ এপ্রিল রাজশাহীতে একদিনের জন্য সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলেও তা স্থায়ী হয়নি। মাসের শুরুতে তাপপ্রবাহ শুরু হলেও দ্রুতই বৃষ্টির কারণে তা কমে যায়। দ্বিতীয় সপ্তাহে আবার তাপপ্রবাহ দেখা দিলেও তা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়নি এবং দেশের সব এলাকায় ছড়ায়নি। সর্বোচ্চ ২২টি জেলায় তাপপ্রবাহ ছিল। মাসের শেষদিকে আবার বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়, যার প্রভাব মে মাসের শুরুতেও বজায় রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর বেশি হলে তা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ।

বৃষ্টিপাতের দিক থেকে বরিশাল বিভাগের পর ঢাকা বিভাগে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। তবে রাজশাহী বিভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ বলেন, মে মাসের প্রথম ১০ দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে, ফলে তাপমাত্রা সহনীয় থাকবে। ১০ মে’র পর থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে এবং ১৫ মে’র পর স্বল্পমেয়াদি তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে, যা ছয় থেকে সাত দিন স্থায়ী হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, এ বছর এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাতের ধরন ছিল অস্বাভাবিক। সাধারণত এ সময় ভারতের উজানে বেশি বৃষ্টি হয়, কিন্তু এবার বাংলাদেশের ভাটিতে প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এদিকে আগামী কয়েক দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের সব জেলায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে। চট্টগ্রামের কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলা এবং ঢাকা বিভাগের নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জেও একই ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। খুলনা বিভাগে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, আর বরিশালে তুলনামূলক কম বৃষ্টি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি ইতিমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী তিন দিনে আরও বাড়তে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদীর কিছু অংশ প্রাক-মৌসুমী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, ফলে হাওরসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ধনু-বাউলাই নদীর পানিও বাড়তে পারে এবং বাউলাই নদী খালিয়াজুড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে ওই অঞ্চলের হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া হবিগঞ্জের কালনি ও সুতাং এবং মৌলভীবাজারের জুড়ি ও মনু নদীর পানিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে এসব জেলার নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি বা অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তবে নেত্রকোনার ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন। তিনি বলেন, বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী ওই এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে, তবে প্রাক-মৌসুমি সময়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

আবহাওয়ার এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আগাম বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝড়-বজ্রপাত মিলিয়ে বোরো ফসলসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে পানির উচ্চতা বাড়লে সদ্য কাটা বা কাটার অপেক্ষায় থাকা ধান আবারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

Link copied!