প্রতীকী ছবি
প্রপাগান্ডার ঝড়ের মধ্যেও যে রাজনীতি টিকে থাকে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থাতেই দাঁড়িয়ে থাকে
“বিএনপির ন্যারেটিভ লাগে না”—একসময় এমন মন্তব্য করেছিলেন রুমিন ফারহানা। সে সময় এই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে বেশ হাসাহাসি হয়েছিল। অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক সরলতা কিংবা অতিরঞ্জন হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বিষয়টি ভিন্নভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাজনীতিতে ‘ন্যারেটিভ’ শব্দটি অনেক সময় একটি কৌশলগত প্রচারণাকে বোঝায়—যেখানে বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় গল্প নির্মাণ, প্রতিপক্ষকে ভিলিফাই করা এবং জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য ধারাবাহিক প্রপাগান্ডা চালানো। গত প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন ন্যারেটিভের ঝড় কম বয়ে যায়নি। ফজরের সময় থেকে রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যমে বিএনপিকে ঘিরে নানা অভিযোগ, সমালোচনা এবং প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই সময়টাতে বিএনপি সমর্থকদের অনেকেই প্রতিনিয়ত সেইসব প্রচারণার জবাব দিতে গিয়ে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থেকেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিবাঙ্ক করা, তথ্য তুলে ধরা, যুক্তি দেওয়া—সব মিলিয়ে এটি যেন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিরোধের ইতিহাস। এমনকি অনেকের ব্যক্তিগত জীবনেও এর প্রভাব পড়েছে; কেউ কেউ পেশাগত বা সামাজিক চাপের মুখেও পড়েছেন।
তবে দলটি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে এবং তুলনামূলক সংযত অবস্থান বজায় রেখেছে। দলীয় প্রধান তারেক রহমান একসময় বলেছিলেন—
“মিথ্যা দিয়ে রাজনীতি হয় না।”
এই বক্তব্যের ভেতরে যে বিশ্বাস ছিল, সময় যেন ধীরে ধীরে তার বাস্তবতা দেখাতে শুরু করেছে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ কথার চেয়ে কাজেই বেশি আস্থা রাখে। রাজনৈতিক ভাষণ যত আকর্ষণীয়ই হোক, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন না থাকলে সেই কথার স্থায়িত্ব থাকে না।
আজ যখন ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তখন মাঠের বাস্তবতা অনেক কথার চেয়েও বেশি শক্তিশালীভাবে সামনে আসছে। অনেক দরিদ্র ও অসহায় নারীর চোখে যে আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তা কোনো সাজানো দৃশ্য নয়। কেউ আনন্দে অশ্রু ফেলছেন, কেউ কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। মানুষের চোখ অনেক সময় এমন সত্য প্রকাশ করে, যা কোনো প্রচারণা দিয়ে তৈরি করা যায় না।
এই মানুষগুলোর অনেকেই শেষ কথায় তারেক রহমানের জন্য দোয়া করছেন। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে—যখন জনগণ অন্তর থেকে তার মঙ্গল কামনা করে।
বিএনপি হয়তো সাংস্কৃতিক প্রচারণা বা রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক দলের মতো সুসংগঠিত নয়। কিন্তু নির্বাচনের সময় যে বার্তা ও সংগঠনের শক্তি তারা প্রদর্শন করেছে, তা অনেক প্রতিষ্ঠিত দলের চেয়েও কার্যকর ছিল—এ কথা অস্বীকার করা কঠিন।
রাজনীতির একটি বড় বাস্তবতা হলো—যে দল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাদের পক্ষে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা সহজ হয় না।
বিএনপির শক্তি সম্ভবত এখানেই যে, নানা সংকটের সময়েও দলটি জনগণের সঙ্গে একটি যোগাযোগ রেখা ধরে রাখতে পেরেছে।
মানুষের দোয়া, বিশ্বাস এবং প্রত্যাশাই যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই পুঁজিই হয়তো আগামী দিনে বিএনপিকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে পারে। যদি সত্যিই মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে আগামী পাঁচ বছরে দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সবশেষে একটি প্রার্থনাই থাকে—
আল্লাহ যেন আমাদের সহায় হন।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
লেখক: খালিদ সাইফুল্লাহ
কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আপনার মতামত লিখুন :