টানা বৃষ্টিতে একের পর এক হাওরের বোরো ফসল পানিতে ডুবে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে কৃষকের মাঝে শুরু হয়েছে হাহাকার। শুধু জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাব বলছে, এ পর্যন্ত জেলার ১২ উপজেলায় এক হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি ডুবে গেছে। তবে কৃষকদের হিসাবে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাস্তবে আরও অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন থেকে পানি নিষ্কাশন কিংবা হাওর রক্ষায় কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দড়িয়াবাজ গ্রামের কৃষক মো. আলাউদ্দিন দেখার হাওরে ৩৫ বিঘা বোরো ধান চাষ করেছেন। চাষাবাদ করা জমির বেশির ভাগ বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। যেগুলো এখনও ভাসমান রয়েছে, সেগুলোও বৃষ্টি হলে তলিয়ে যাবে।
তিনি জানান, ঋণ করে জমি চাষাবাদ করেছেন। এত কষ্টের ফসল নষ্ট হলে সারাবছর পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন– এই চিন্তায় দিন কাটছে না এখন। গরু-বাছুরের খড় কোথা থেকে আসবে– এই চিন্তাও মনে ভর করেছে। দুয়েক দিনের মধ্যে হাওর থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করলে রক্ষা পেতে পারে ধান– মন্তব্য করলেন এই কৃষক।
থেমে থেমে বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন হাওরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের কাঁচা বোরো ধান। ফসল রক্ষা করতে গিয়ে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করলে প্রশাসনের সঙ্গে কৃষকদের উত্তেজনা ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। ঝুঁকি এড়াতে কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গত সোমবার শহরে মতবিনিময় করেছে জেলা প্রশাসন। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কয়েকটি বাঁধে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা।
গত সোমবার সরেজমিন দেখার হাওর এলাকার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দড়িয়াবাজ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমির সবুজ বোরো ধান পানির নিচে ডুবে আছে। কোথাও কোমর সমান, কোথাওবা তার চেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা। স্থানীয়দের মতে, এই একটি এলাকায় অন্তত ১৮টি গ্রামের শতাধিক হেক্টর জমির কাঁচা বোরো ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে।
হাওরপাড়ের দড়িয়াবাজ গ্রামের মুক্তার আলী বলেন, হাওরের পানি নিষ্কাশন হয় উতারিয়া বাঁধ হয়ে মহাসিং নদীতে। এ জন্য আমরা প্রতিবছর দাবি জানিয়েছি, এখানে যেন স্লুইসগেট দেওয়া হয়। আমাদের কথা শোনে না দায়িত্বশীলরা। এ বছর জমির ধান পাকার আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পরিকল্পিতভাবে আমাদের এমন ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে। লাভবান হয়েছেন যারা বাঁধ নির্মাণ করেছেন তারা।
কৃষক নুর আহমদ বলেন, আমরা দেখার হাওরের নিচু জমিতে বোরো ধান চাষ করি। এক বিঘা জমি করতে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হয়। কত কষ্ট, স্বপ্ন নিয়ে চাষবাস করেছি! এখন আমার মতো হাজারো কৃষকের মাথায় হাত। সারা বছর কীভাবে সংসার চলবে জানি না। পানি যদি অপসারণ করা না যায়, শতাধিক হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে যাবে।
একই ইউনিয়নের খলাউড়ার বাসিন্দা কৃষক মো. নজির হোসেন বলেন, দেখার হাওরের উতারিয়ার বেড়িবাঁধে অপরিকল্পিত কাজ করায় আমাদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। পানি অপসারণের ব্যবস্থা না করলে মরণ ছাড়া পথ দেখছি না।
শুধু দেখার হাওরের এই অংশই নয়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জুয়ালভাঙ্গা ও কানলার হাওরেও একই অবস্থা। এ ছাড়া মধ্যনগর, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ ও দিরাই-শাল্লা উপজেলা থেকে কৃষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। জেলার সবকটি হাওরের নিচু এলাকায় কমবেশি জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষক নিজেই বাঁধ কেটে পানি অপসারণ করার চেষ্টা করছেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফারুক আহমদ বললেন, উভয় সংকটে পড়েছেন কৃষক। বাঁধ কেটে পানি নামাতে গিয়ে আরেক বিপদ হতে পারে। ভবিষ্যতে হাওরে বাঁধ দেওয়ার আগে নতুন করে এসব নিয়ে ভাবতে হবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক নেতা সালেহ আহমদ জানিয়েছেন, খরচার হাওরের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২০০ একর ও আঙ্গারুলি হাওরের ৫০ একর জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
দিরাই উপজেলার ধল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কৃষক নেতা দীন ইসলাম বলেন, বরাম হাওরের নিচু এলাকার জমিতে পানি ধান নষ্ট করছে। কুলঞ্জ ইউনিয়নের বাদালিয়া হাওরেও একই অবস্থা। বরামের পাঠাকাউরি ও বাদালিয়া স্লুইসগেট দিয়ে পানি ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন কালনী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। না হয় উল্টো পানি ঢুকবে হাওরে।
শাল্লার বড় কৃষক শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া বললেন, কিছু ধান বিলের তলানিতে করেন কৃষকরা। এসব বাঁচানো কঠিন। কিন্তু ওপরের রেকর্ডীয় জমিতেও পানি লেগেছে। উপজেলার ছাপটা, জুয়ারিয়া ও কুশিয়াল দাইড় হাওরের ১৫০ হেক্টর জমি ডুবায় ধরেছে। বৃষ্টি হলে আরও ডুববে। অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে এমনটি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বললেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে ইতোমধ্যে ৩০ ভাগ ধান পানির নিচে তলিয়েছে। এই ধান আরও এক সপ্তাহ পানির নিচে থাকলে কৃষক গোলায় তুলতে পারবেন না, নষ্ট হয়ে যাবে। প্রশাসন এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, আমরা ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করি বাইরের পানি আটকানো জন্য। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার এই সময়ে ৭০ থেকে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কৃষক। কারণ তাদের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই অনেকেই চেষ্টা করছেন বাঁধ কাটার।
তিনি বলেন, আমরা সভা করে বলেছি, কৃষকরা যেন নিজ উদ্যোগে বাঁধ না কাটেন। কারণ এখন যে কোনো বিপর্যয় এলে বাঁধের কাটা অংশ দিয়ে হাওরে পানি ঢুকবে। এতে ফসল আরও ঝুঁকিতে পড়বে। তাই উপজেলায় উপজেলায় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাঁধ কেটে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা হবে।