ঢাকা শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২
amaderkhobor24.com

ইরানযুদ্ধে আকাশছোঁয়া হচ্ছে বিমানভাড়া

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৬, ১০:০১ এএম

ইরানযুদ্ধে আকাশছোঁয়া হচ্ছে বিমানভাড়া

গ্রীষ্মকাল ঘিরে দীর্ঘ দূরত্বের বিমানভাড়া কিছুটা স্বাভাবিক হবে—এমন আশায় থাকা আন্তর্জাতিক ভ্রমণপ্রত্যাশীদের জন্য আসছে বড় ধাক্কা।

এশিয়া ও ইউরোপকে সংযুক্তকারী প্রধান রুটগুলোতে টিকিটের দাম চলতি মাসেই সর্বোচ্চ ৫৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অ্যালটন এভিয়েশন কনসালটেন্সির তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুদ্ধজনিত ব্যাঘাত বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত এয়ার ট্রানজিট করিডরটিকে অস্থির করে তুলেছে—এবং এর প্রভাব গ্রীষ্ম পেরিয়ে শরৎকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

জুন মাসের ভ্রমণের ক্ষেত্রে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপগামী সাতটি জনপ্রিয় রুটে ভাড়া গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়বে। বিশ্লেষণটি করা হয়েছে সিরিয়াম এবং অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে। বর্তমানে সিডনি থেকে লন্ডনের একটি টিকিটের গড় মূল্য ১,৫০০ ডলারের বেশি—যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এসব ভাড়ার মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট, ওয়ান স্টপ ফ্লাইট এবং উপসাগরীয় হাব হয়ে যাওয়া ট্রানজিট সবই অন্তর্ভুক্ত।

ফলে দেখা যাচ্ছে, আকাশপথে ভ্রমণে স্বস্তির কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবর পর্যন্তও ভাড়া গত বছরের তুলনায় অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি থাকতে পারে।

 

সস্তা ফ্লাইটের যুগ কি শেষ?

উল্টো দিকের রুটগুলোতেও একই চাপ স্পষ্ট। ইউরোপ থেকে এশিয়াগামী উড়োজাহাজের ভাড়া জুনে সর্বোচ্চ ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, আর কিছু দীর্ঘ দূরত্বের রুটে ভাড়া গত বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর শুরু হওয়া এই অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে বৈশ্বিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাও সামনে এসেছে। আকাশপথ বন্ধ, উপসাগরীয় হাবগুলোতে সক্ষমতা হ্রাস এবং জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসেও তা উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে।

এই অনিশ্চয়তা ইতোমধ্যেই ভ্রমণ চাহিদায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সিরিয়াম-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী গ্রীষ্মকালীন বুকিং এক বছর আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে, আর বিপরীতমুখী যাত্রায় কমেছে ১১ শতাংশ। এশিয়া থেকে ইউরোপগামী বুকিংও ৪.৪ শতাংশ কমেছে—যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া রুটও রয়েছে।

সংঘাত দ্রুত শেষ হলেও ভাড়ার ওপর চাপ সহজে কমবে না বলে মনে করছেন অ্যালটনের ব্যবস্থাপনা পরিচালন ব্রিয়ান টেরি।

তার ভাষায়, "জেট ফুয়েল সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে মূল্য কমার প্রভাব পৌঁছাতে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আমরা যা দেখছি, তা কেবল স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা নয়—তাৎক্ষণিক সংকট কেটে গেলেও দীর্ঘ রুট, সীমিত সক্ষমতা এবং বাড়তি জ্বালানি খরচ—দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়ার ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রাখবে।"

 

৫৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়ার উল্লম্ফন

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়া ও ইউরোপকে যুক্তকারী রুটগুলো, যার অনেকগুলোই দুবাই, আবুধাবি ও দোহার মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল হাবের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষক সংস্থা রোলান্ড বার্জার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই করিডরটি সাধারণত দুই অঞ্চলের মধ্যে মোট বার্ষিক যাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিচালনা করে।

এই করিডর দিয়ে যাত্রীবাহী বিমান চলাচলের ব্যাঘাত ভাড়া বৃদ্ধির চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হংকং থেকে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর-এর টিকিট ২৩ মার্চ পর্যন্ত গড়ে ৩,৩১৮ ডলারে পৌঁছেছে—যা আগের মাসের তুলনায় ৫৬০ শতাংশ বেশি। ব্যাংকক থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট রুটে ভাড়া ৫০৫ শতাংশ বেড়ে ২,৮৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী "ক্যাঙ্গারু রুট"-ও বড় আঘাত পেয়েছে। সিডনি থেকে লন্ডন রুটে ভাড়া বেড়েছে ৪২৯ শতাংশ।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই রুটগুলোতে চাহিদা ও ভাড়া—দুটিই বেড়েছে, যদিও ইউরোপীয় ও এশীয় এয়ারলাইনগুলো সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু, প্রায় এক মাস পরও বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান নেটওয়ার্ক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারছে না।

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে, যা মোটের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

এয়ারলাইনগুলো ইতোমধ্যেই এই বাড়তি খরচ যাত্রীদের ওপর চাপাতে শুরু করেছে। ফ্লাইটের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের পেছনে ভূমিকা রাখা জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির ফলে সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজ ও এয়ার নিউজিল্যান্ড-এর মতো এয়ারলাইনগুলো এ মাসেই জ্বালানির সারচার্জ বাড়িয়েছে।

স্বাধীন ভ্রমণ বিশ্লেষক হ্যানমিং লি বলেন, "বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত, (আকাশপথের) ভ্রমণ ব্যবস্থায় একটা বিশৃঙ্খলা চলছে। যদি যাত্রীরা দেখে ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, দেরি হচ্ছে বা বিঘ্ন ঘটছে, তাহলে তারা ভ্রমণ করা বা কীভাবে ভ্রমণ করবে—সেটা নিয়ে খুব ভেবেচিন্তে তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।"

Link copied!