প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। সব কিছু নাকি প্রস্তুত। সংগ্রহ করা হয়েছে লাশ বহনকারী রিকশা থেকে শুরু করে শহীদদের রক্তমাখা জামা-কাপড়সহ ব্যবহার্য জিনিসপত্র। গণভবনের পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে শত শত প্রতীকী কবর। আচমকা কেউ দেখলে মনে হবে এ যেন কোনও এক কবরস্থান। প্রকল্প সংশ্লিষ্টসহ ইউনূস সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে শহীদদের ব্যবহার্য এসব জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছেন। ড. ইউনূসের আমলে কয়েকবার খুলে দেওয়ার তারিখ চূড়ান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। খুলবে কবে কেউ তা জানে না।
আন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস প্রকল্পটি পরিদর্শন করেন কয়েকবার। বিদেশিদেরও পুরো গণভবন এলাকা ঘুরে দেখান তিনি। নিজে উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলাদাভাবেও দেখেছেন। বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের জানান, অবিলম্বে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এই জাদুঘর। তারপরও ১৮ মাসের শাসনামলে তৈরি করা জুলাই স্মৃতি জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে যেতে পারেননি।
সূত্র জানিয়েছে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেউই জানেন না কবে খুলে দেওয়া হবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। এ সংক্রান্ত কোনও বার্তা নাই তাদের কাছে। নতুন সরকারের সংশ্লিষ্টরাও জানেন না কবে উন্মুক্ত করা হবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই ‘কিছু কাজ বাকি আছে’ জানানো হলেও কী কাজ বাকি আছে, তা জানান না কেউ। দ্রুতই খুলে দেওয়া হবে বলা হলেও কোন মাসের কত তারিখ তা কিছুই জানাতে পারে না সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা। তবে জুলাই জাদুঘর সর্বস্তরের মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার বিষয়ে বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতাদের অনেকটাই অনীহা রয়েছে বলে জানা গেলেও এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’কে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বা ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে’ রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘গণভবন’কে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই জাদুঘর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ভেতরের ভাস্কর্য
সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনকে জুলাই বিপ্লব, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনামলের স্মৃতি সংরক্ষণই এর মূল উদ্দেশ্য। জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ছবি, শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, সংবাদপত্রের ক্লিপিং এবং অডিও-ভিডিও এখানে প্রদর্শিত হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের দৃশ্য ও স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা তুলে ধরার বিশেষ স্থান থাকবে এই জাদুঘরটিতে। জাদুঘরটি পরিচালনার জন্য ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জাদুঘরটির উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এর চূড়ান্ত কাজের সমাপ্তি না হওয়ায় উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি।
সরকার সংশ্লিষ্টরা জানান, এই জাদুঘরে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের ‘ফ্যাসিবাদ’, জুলাই বিপ্লবের ঘটনা, শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন এবং গণঅভ্যুত্থানকালে বিক্ষোভকারীদের গণভবনে প্রবেশের দৃশ্য তুলে ধরা হবে। এছাড়া, বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন ও আয়নাঘরের মতো নির্যাতনের চিত্রগুলো প্রদর্শিত হবে এখানে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করেছে এবং এটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অংশ হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি হলো শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে গণরোষের প্রতীক; যা এখন একটি ‘জনগণের ভবন’ হিসেবে সংরক্ষিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১ জুন সেই সময়কালের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসেই অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জাদুঘরটি চালু করা হবে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর আগেই হাজার হাজার দুর্বৃত্ত গণভবনে প্রবেশ করে সরকারি সম্পদ নষ্ট করে। লুট করে নেয় গণভবনে রাষ্ট্রীয় ব্যবহার্য সব জিনিসপত্র। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা এবং গণভবনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টারগুলোতে হামলা করা হয়, চালানো হয় ধ্বংসযজ্ঞ। দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে গেছে গণভবন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য আসবাবপত্র থেকে শুরু করে গৃহপালিত হাঁসমুরগি, গরু-ছাগল, পুকুরের মাছসহ বাথরুমে ব্যবহার করা বদনা পর্যন্ত। খুলে নেওয়া হয় গণভবনের দরজা-জানালা ও জানালার গ্লাস, সিঁড়ির রেলিং, এমনকি ফ্লোরের টাইলস পর্যন্ত।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গণভবন পরিদর্শন করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আদিলুর রহমান খান। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর পুনরায় গণভবন পরিদর্শন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদসহ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বাস্তবায়নে লেখক ও গবেষক এবাদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যের এক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিকে জাদুঘরের নকশা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৭-১৯ সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটিতে স্থপতি, আলোকচিত্রী, গবেষক এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের দ্য সানডে টাইমস পত্রিকা গণভবন নিয়ে একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের দল লেবার পার্টির মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের প্রচারপত্র ও পোস্টার, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রকাশ আটকে দিতে আইনি পরামর্শপত্র, বিদেশি ব্যাংকে হিসাব খোলার আবেদনপত্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কূটনৈতিক বার্তার কপি, জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকার হীরার মান যাচাইয়ের সনদ, জার্মানির মন্টব্ল্যাঙ্ক কোম্পানির প্রস্তুত করা প্রায় দেড় হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকার বেশি) মূল্যের সোনার প্রলেপযুক্ত কলম, নামি ব্রান্ডের শপিং ব্যাগ, বিদেশি বিশিষ্টজনদের উপহার দেওয়া বিভিন্ন পোশাক-গহনা, তৈজসপত্রসহ আরও নানা ধরনের জিনিসপত্র পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়; যা সবই লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
এ বিষয় জানতে যোগাযোগ করা হয় ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে নিহত কাজি হৃদয়ের বাবা মো. সরোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, ঘটনার কয়েক মাস পরে এসে কয়েকজন লোক সরকারি অফিসার বলে ছেলের ব্যবহৃত জামা-কাপড় নিয়ে গেছেন। তারা বলেছেন, এগুলো জাদুঘরে রাখা হবে। মানুষ দেখবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ক্ষমতায় থাকাকালে জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের ব্যবহৃত জিনিস স্মৃতি আকারে সংগ্রহ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে এটা শুরু হয়। এর জন্য বড় টিম তৈরি করা হয়েছিল। যারা দেশজুড়ে এই সংগ্রহের কাজটি করে। এ লক্ষ্যে কমিটি এবং অনেকগুলো সাব-কমিটি কাজ করেছে।
বিষয়টি জানতে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী এম এ সাত্তারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কবে নাগাদ খুলে দেওয়া হবে, সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু কাজ বাকি আছে, মূলত সে জন্যই দেরি হচ্ছে।
কী কাজ বাকি আছে, জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
চলতি বছরের মধ্যে সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে খৈয়াম জানান, চেষ্টা চলছে। তবে মাস বা তারিখ এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
আপনার মতামত লিখুন :