ঢাকা রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২
amaderkhobor24.com

জনপ্রিয় হেডফোনে মিলল ক্যানসারের ঝুঁকির বিষাক্ত রাসায়নিক, সতর্ক করলেন গবেষকেরা

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

জনপ্রিয় হেডফোনে মিলল ক্যানসারের ঝুঁকির বিষাক্ত রাসায়নিক, সতর্ক করলেন গবেষকেরা

জনপ্রিয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হেডফোনে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ইউরোপীয় গবেষকেরা। তাঁদের দাবি, এসব উপাদান দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারসহ গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ইউরোপের ‘টক্সফ্রি লাইফ ফর অল’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এক গবেষণায় বাজারে পাওয়া ৮১টি ইন-ইয়ার ও ওভার-ইয়ার হেডফোন পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা জানিয়েছেন, পরীক্ষিত প্রতিটি পণ্যে এমন রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে, যা মানবদেহের হরমোন–ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে। গবেষণায় বোস, প্যানাসনিক, স্যামসাং ও সেনহাইজারের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডের হেডফোনেও এসব ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হেডফোনের প্লাস্টিক অংশ থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে এসে দীর্ঘ সময় ত্বকের সংস্পর্শে থাকার কারণে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষকেরা মূলত এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং বা হরমোন ব্যাহতকারী রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করেছেন। এতে বিসফেনল–এ (বিপিএ) এবং বিসফেনল–এস (বিপিএস) নামের উপাদান পাওয়া গেছে, যেগুলোকে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। এই উপাদানগুলো মানবদেহে নারী হরমোন ইস্ট্রোজেনের মতো আচরণ করতে পারে। এর ফলে মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল আগেভাগে শুরু হওয়া, পুরুষদের ক্ষেত্রে হরমোনগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত হেডফোনগুলোর প্রায় ৯৮ শতাংশে বিপিএ পাওয়া গেছে। বিপিএস শনাক্ত হয়েছে তিন-চতুর্থাংশের বেশি নমুনায়। কিছু হেডফোনে এসব রাসায়নিকের মাত্রা ছিল প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। ইউরোপীয় কেমিক্যালস এজেন্সির সুপারিশ অনুযায়ী নিরাপদ সীমা কেজিপ্রতি ১০ মিলিগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে সেনহাইজার অ্যাকসেনটাম ট্রু ওয়্যারলেস এবং বোস কুইটকমফোর্টসহ কয়েকটি জনপ্রিয় মডেলে এই সীমা ছাড়িয়েছে। গবেষকেরা বলেন, দীর্ঘ সময় কানে লাগিয়ে রাখার কারণে হেডফোন ব্যবহারে ত্বক এসব রাসায়নিক শরীরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে। আগের গবেষণায় দেখা গেছে, বিপিএ ও বিপিএস প্লাস্টিক থেকে ঘামের মধ্যে মিশে যেতে পারে এবং পরে ত্বকের মাধ্যমে শরীরে শোষিত হতে পারে।

বিশেষ করে খেলাধুলার সময় ব্যবহৃত ইন-ইয়ার হেডফোনে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ, ব্যায়ামের সময় শরীরের তাপ ও ঘামের উপস্থিতিতে রাসায়নিক স্থানান্তরের হার বেড়ে যেতে পারে।

প্রকল্পের অংশীদার সংস্থা আরনিকারের রাসায়নিক বিশেষজ্ঞ কারোলিনা ব্রাবকোভা বলেন, এসব রাসায়নিক পণ্যের উপাদান হিসেবে তো থাকছেই পাশাপাশি ব্যবহারকারীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। নিয়মিত ব্যবহার, বিশেষ করে ঘাম ও তাপের কারণে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। তিনি আরও বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা না দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে কিশোরদের মতো সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি উদ্বেগজনক।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু ও কিশোরদের লক্ষ্য করে বাজারজাত করা অনেক হেডফোনেও বিপিএ ও বিপিএসের উচ্চমাত্রা রয়েছে। গবেষকেরা মনে করেন, একটি উৎস থেকে পাওয়া সামান্য মাত্রা হয়তো বড় ক্ষতি না করলেও বিভিন্ন উৎস থেকে রাসায়নিক একত্র হয়ে ‘ককটেল প্রভাব’ তৈরি করতে পারে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিসফেনলের পাশাপাশি কিছু হেডফোনে ফথালেট নামের রাসায়নিকও পাওয়া গেছে, যা প্রজননক্ষমতার ক্ষতি করতে পারে। এ ছাড়া ক্লোরিনযুক্ত প্যারাফিনও শনাক্ত হয়েছে, যা লিভার ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে। তবে এসব উপাদান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুব সামান্য মাত্রায় ছিল।

গবেষকেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত হরমোন-ব্যাহতকারী রাসায়নিক নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। টক্সফ্রি লাইফ ফর অল অংশীদারত্বের প্রধান এমেসে গুলিয়াস বলেন, ভোক্তাদের সুরক্ষায় বিষাক্ত রাসায়নিকের পুরো শ্রেণি নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যাতে এগুলোর পরিবর্তে সমান ক্ষতিকর বিকল্প ব্যবহার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

Link copied!