ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২
amaderkhobor24.com

৪ হাজার নারী-পুরুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়েছে সন্ধানী

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম

৪ হাজার নারী-পুরুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়েছে সন্ধানী

যার দুই চোখ অন্ধ। এ অপূর্ব পৃথিবীর সৌন্দর্য তিনি দেখতে পারছেন না। জন্মদাতা পিতামাতাসহ আপনজনেরা দেখতে কেমন, তা তিনি জনতে পারছেন না। শুধু তাদের কথা শুনছেন, নানা গল্পগুজব, হাসিঠাট্টাসহ কত না আলাপ হচ্ছে প্রিয়জনদের সঙ্গে। তাদের দেখার শত ইচ্ছা থাকলেও দেখতে পারছেন না- এ মানসিক যন্ত্রণা অন্ধ লোকটিকে কুরে কুরে খাচ্ছে, নীরবে চোখের পানি ফেলছেন তিনি।

সারা বিশ্বের লাখ লাখ অন্ধ নারী-পুরুষই এমন কষ্ট বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ দেখে কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে তাদের অনেকেই আবার পৃথিবীর সবকিছু দেখতে পারেন- এমন ব্যবস্থা চিকিৎসা বিজ্ঞানে রয়েছে।

১৯৮৪ সাল থেকে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি অন্ধ লোকের চোখে কর্নিয়া সংযোজনের মহৎ কাজটি করে আসছে। শত শত অন্ধ নারী-পুরুষ কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি লায় করছেন। এদেরই একজন পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার ময়দাশ্রীনগর গ্রামের বাসিন্দা স্মৃতি (৩২)। গতকাল শুক্রবার দৈনিক ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি স্মৃতিকে টেলিফোন করলে তার ফুফু আশা ফোন ধরেন। তিনি জানান, স্মৃতি একটু বাইরে গেছে। স্মৃতি কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‍‍`স্মৃতি ভালো আছে, তাকে বিয়ে ও দেওয়া হয়েছে। দুই চোখে দেখতে পারছে। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির মাধ্যমে তার চোখে কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে দুই চোখে ভালোই দেখতে পায় সে।‍‍` আশা বলেন, ‍‍`আমিসহ আমার পরিবারের সব সদস্য মরণোত্তর চক্ষুদান করে যাব।‍‍` এ জন্য কয়েক দিন পরই তারা ঢাকায় সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতিতে গিয়ে অঙ্গীকারনামা দিয়ে আসবেন। আশা বলেন, অন্ধ স্মৃতি দুই চোখে আবার দেখতে পাবে এটা তাদের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।

স্মৃতির ২০২১ সালে এক চোখে এবং ২০২২ সালে অপর দেখে চিকিৎসকরা কর্নিয়া সংযোজন করেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় সুই চোখে কম দেখতে শুরু করেন স্মৃতি। এইচএসসিতে ওঠার পর দুই চোখে আর দেখতে পাননি তিনি। এই অবস্থা পরিবারে নেমে আদে হতাশা। পরে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে স্মৃতির পরিবার। এরপর কর্নিয়া সংযোজনের ফলে স্মৃতি ফিরে পান নতুন এক আনন্দময় জীবন।

যশোরের শার্শা উপজেলার বহিলা গ্রামের বাসিন্দা মো. জহিরুল ইসলামের (২৯) দুই চোখে দেখতে পারতেন না। ২০১০ সালে ভার এক চোখে কনিয়া সংযোজন করা হয়। দ্বিতীয় চোখে ২০১২ সালে কর্নিয়া সংযোজনের মাধ্যমে তিনি এখন দুই চোখেই দেখতে পারছেন এবং ঢাকরি করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।

বাংলাদেশে অন্ধত্ব একটি অন্যতম সমস্যা। অন্ধ ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য বোখা। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির তথ্যানুযায়ী দেশে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ দৃষ্টিশক্তিহীন। এর মধ্যেও লাখের মতো কর্ণিয়াজনিত অন্ধ। প্রতি বছর নতুন করে যোগ হচ্ছে ৪০ হাজার অন্ধ।

সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মরণোত্তর চক্ষুদানে অঙ্গীকার করেছেন ৪৫ হাজার ৯৯ জন। কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়েছে ৪১৯৬টি এবং কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ৩৫৩৩ জনের। তারা এখন সবাই পৃথিবীর আলো দেখতে পারছেন। গত মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রাম চান্দগাঁও বড়ুয়াপাড়া নিজ বাসভবনে স্মৃতিমান ভিক্ষু (৮২) মারা যান। তার পুত্র স্মৃতি ইন্দ্রিয় ভিক্ষু (শিপুল বড়ুয়া) সন্ধানী আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংকে যোগাযোগ করলে সন্ধানীর একটি টিম তাদের বাসায় গিয়ে মৃত স্মৃতিমান ভিক্ষুর দুই চোখের কর্নিয়া সংগ্রহ করেন। জীবিত থাকাকালে স্মৃতিমান তার পরিবারের কাছে চক্ষুদানের ইচ্ছা পোষণ করে গিয়েছিলেন।

পরদিন সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালের কর্নিয়াল সার্জন ডা. সৈয়দ এ হাসান চাঁদপুর জেলার শাহরস্তি উপজেলার শোরসাক গ্রামের আশরাফুল ইসলাম নিরব (১৭) ও টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার বড়কুড়িয়া গ্রামের রেশমা আক্তার ইভার (১৭) চোখে স্মৃতিমান ভিক্ষুর কর্নিয়া সংযোজন করেন। স্মৃতিমান মারা গেছেন কিন্তু তার চোখ দিয়ে দুই তরুণ-তরুণী এখন পৃথিবীর আলো দেখবে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি উপায়-এমনটাই জানালেন সন্ধানীর মহাসচিব ডা. মনির হোসেন।

১৯৭৯ সালে সন্ধানী নামের স্বেচ্ছায় রক্তদান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একদল ছাত্র ও তাদের বন্ধুবান্ধব। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল কাদেরের সহায়তায় প্রথম বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করে সন্ধানী। সন্ধানীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ডা. ইদ্রিস আলী মঞ্জু প্রথম রক্তদান করে। শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ১৯৭৯ সালের ১৭ জানুয়ারি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দ্বিতীয় প্রথম স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করে সন্ধানী। সন্ধানী জাতীয় রক্তদান ১৯৭৯ সালে ও জাতীয় চক্ষুদান সমিতি ১৯৮৪ সাল থেকে আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে আসছে। সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক কাশেম বলেন, মরণোত্তর চক্ষুদানে সবাই সচেতন হলে অন্ধত্ব আর থাকবে না।

২০০৪ সালে সমাজ সেবায় বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সংগঠন হিসেবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছে সন্ধানী।

Link copied!