ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২
amaderkhobor24.com

যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঈদ কাটছে আতঙ্কে

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: মার্চ ১৯, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঈদ কাটছে আতঙ্কে

আনন্দের ঈদে এবার আতঙ্কই বেশি মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে। মাথার ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের ওড়াউড়ি দেখতে হচ্ছে তাঁদের, কখন কোথায় আঘাত হানে, সেই ভয় নিয়ে থাকতে হচ্ছে প্রতিক্ষণ।

ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালানোর পর শুরু হয়েছে এই যুদ্ধ। পাল্টাপাল্টি হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও। তার মধ্যেই শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত দেশগুলোতে ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি রয়েছেন। জীবিকার প্রয়োজনে নানা ক্ষেত্রে কাজ করেন তাঁরা। যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরব, বাহরাইন, আমিরাত ও ইরাকে কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যাঁরা আছেন, মৃত্যুভয় সঙ্গী করে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের। পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রবাসজীবনে এবারের ঈদে উৎসবের রং নেই, রয়েছে উদ্বেগ।

এবার ব্যতিক্রমী একটি ঈদ কাটাতে যাচ্ছেন বলে জানান কাতারপ্রবাসী কবীর (ছদ্মনাম)। আল-শাহনিয়া শহরের একটি ব্যাংকে হিসাবরক্ষকের কাজ করেন তিনি। সাত বছর ধরে তিনি রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে।

যুদ্ধের কারণে সে দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার ঈদের কোনো আমেজ নেই। আমার কর্মস্থলে প্রায়ই পুলিশ আসছে এবং আমাদের সতর্ক করে যাচ্ছে। এমনকি ব্যাংকে থাকা অবস্থায় যদি সতর্কসংকেত বা অ্যালার্ম বাজে, তবে গ্রাহকসহ কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে, সে বিষয়েও তারা আমাদের বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে।’

কাতারের বাসিন্দাদের মুঠোফোনে সরকারের পক্ষ থেকে খুদে পার্তায় প্রতিনিয়ত সতর্ক করা হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে জরুরি নির্দেশনা। পরিস্থিতি খারাপ হলে ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে।

নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে কবীর বলেন, ‘আমি যে ব্যাংকে কাজ করি, সেখান থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরেই বোমা হামলা হয়েছে। এমন সময়ও গেছে, যখন দিনে দুই থেকে তিনবার হামলা হয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় টানা ১০ দিন ঘরেই থাকতে হয়েছে। ওই ১০ দিনের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’

বর্তমানে কবীরের শহর আল-শাহনিয়ায় চলাচলের ওপর কিছুটা শিথিলতা আনা হলেও আয়ান খালেদ, আল ওয়াব বা লুসাইল সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ইরানের হামলার আশঙ্কায় জনগণের অবাধ চলাচল বন্ধ রয়েছে।

ঈদ নিয়ে কবীর বলেন, ‘আগে ঈদের দিনে আমরা এক শহর থেকে অন্য শহরে বন্ধুদের কাছে বেড়াতে যেতাম। কিন্তু এবার বোমা হামলার আশঙ্কায় বেশির ভাগ শহরে অবাধ চলাচল বন্ধ রয়েছে। তাই আমরা যেখানে আছি, সেখানেই থাকতে হচ্ছে।’

এমনকি ঈদের নামাজের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে নিরাপত্তার কারণে। কবীর জানান, বিগত বছরগুলোতে তাঁরা খোলা আকাশের নিচে বড় ময়দানে ঈদের নামাজ পড়তেন। তবে এবার নিরাপত্তার খাতিরে সবাইকে উন্মুক্ত স্থানের পরিবর্তে মসজিদের ভেতরেই ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে।

কুয়েতেও নেই ঈদের আমেজ
এবারের ঈদে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন কুয়েতপ্রবাসী আজিজ আহমেদ (ছদ্মনাম)। ৯ বছর ধরে কুয়েতের আল–জাহারা এলাকার একটি ক্লিনিং কোম্পানিতে কাজ করছেন তিনি। প্রতিবার সম্ভব না হলেও, এবারের ঈদটি পরিবারের সঙ্গে কাটাতে আগেভাগেই বিমানের টিকিট কেটেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাঁর পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যায়।

আজিজের বাড়ি নরসিংদীতে। ১৬ মার্চ দেশে ফেরার জন্য তাঁর টিকিট কাটা ছিল। তবে এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় এবং বিমানবন্দর ও ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার স্বপ্ন নিয়ে টিকিট কাটলেও শেষ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতেই উৎসবহীন ঈদ কাটাতে হচ্ছে তাঁকে।

কুয়েতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আজিজ বলেন, নিরাপত্তার খাতিরে এবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু কড়াকড়ি আরোপ করেছে। তিনি বলেন, ‘কুয়েত প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছে, এবার খোলা আকাশের নিচে বা বড় কোনো ময়দানে ঈদের জামাত হবে না। সবাইকে মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে।’

অন্যান্য বছর ঈদের ছুটিতে ১০–১৫ জন বন্ধু মিলে গাড়ি নিয়ে অন্য শহরগুলোতে বেড়াতে যেতেন আজিজ, এবার নিরাপত্তার কারণে তা–ও বন্ধ।

দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কুয়েত পুলিশ ও প্রশাসন অত্যন্ত তৎপর বলে আজিজ জানান। সম্প্রতি পুলিশের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের একটি সভা ডেকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় জানানো হয়েছে, যদি যুদ্ধের সতর্কসংকেত বা সাইরেন বাজে, তবে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে এবং কীভাবে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। এ ছাড়া প্রবাসীরা যেন নিয়মিত যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নির্দেশনা ও সতর্কবার্তা মেনে চলেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আজিজ জানান, কুয়েত প্রশাসনের পাশাপাশি তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাওয়া জরুরি নির্দেশনাগুলোও মেনে চলছেন। তবে তিনি বর্তমানে যে এলাকায় অবস্থান করছেন, সেখানে সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা সেভাবে নেই বলে কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

অন্য দেশগুলোতেও চিত্র একই
কাতার ও কুয়েত ছাড়াও সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানেও যুদ্ধ-পরিস্থিতি ঈদের আনন্দে বাদ সাধছে। এসব দেশের যেসব এলাকায় মার্কিন ঘাঁটি আছে, সেসব এলাকায় থাকা প্রবাসীরা সবচেয়ে ভীতিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতেও আছে আতঙ্ক। তবে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সৌদি আরবের মক্কা ও জেদ্দায় থাকা দুজন প্রবাসী বাংলাদেশি প্রথম আলোকে বলেন, শুরুর দিকে কিছুটা আতঙ্ক থাকলেও এখন তা অনেক কমে এসেছে। মক্কা, মদিনা ও জেদ্দার মতো শহরগুলোতে মানুষ কাজে যাচ্ছেন, ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটাও করছেন।

পরিচিতজনদের বরাত দিয়ে ওই দুই প্রবাসীই জানান, দেশের পূর্বাঞ্চলের এলাকাগুলোতে আতঙ্কের পরিবেশ আছে, বিশেষ করে যেসব এলাকা উপসাগরের তীরবর্তী। সৌদির রাজধানী রিয়াদেও বাড়তি সতর্কতা আছে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় থাকা একজন প্রবাসী বাংলাদেশি জানিয়েছেন, বাহরাইনে কয়েক দিন আগে ইরানের হামলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এখন প্রয়োজন ছাড়া অনেকে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না। কোথাও জোরে শব্দ হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

মানামা থেকে ওই প্রবাসী বাংলাদেশি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাহরাইনে যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো বিষয় অনলাইনে প্রকাশ করার কারণে অনেককে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হচ্ছে। ইরানের হামলায় কখন কী হয়, সেই আতঙ্ক তো আছেই। এ ছাড়া আছে কাজ হারানোর আশঙ্কা। যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে চলে গেছেন, তাঁদের অনেকেই চাকরি হারানোর আতঙ্কের মধ্যে আছেন। এই পরিস্থিতিতে মনে কি আর আনন্দ থাকে।’

ওমানের সোহার শহরে থাকা একজন প্রবাসী বাংলাদেশি জানালেন, তিনি এবার দেশে ঈদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ–পরিস্থিতির কারণে দেশে ফিরতে পারেননি। তবে তিনি যে শহরে আছেন, সেখানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। অবশ্য মানুষের মধ্যে এমন ভয় আছে যে যেকোনো সময় হামলা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে এবারের ঈদকে ভয় ও আতঙ্কের ঈদ বলে মনে করছেন এই প্রবাসী।

বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ, সংবাদ প্রচারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

যেমন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহে প্রবাসীদের উদ্দেশে দেওয়া এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘সৌদি আরবের স্থানীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত কোনো ছবি বা ভিডিও আপলোড, কোনো সংবাদ প্রচার, শেয়ার, লাইক বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।’

Link copied!