প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা কিছু নাম সময়ের সঙ্গে আলাদা গুরুত্ব পায়। তেমনি এক পরিচিত নাম ফারিদা ইয়াসমিন—যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থেকে সংগঠন, আদর্শ ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সাহসী নারী সংগঠক হিসেবে।
শিক্ষকতা পেশা থেকে রাজনীতিতে এসে তিনি শুধু দলীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং সংগঠনের প্রতি নিষ্ঠার মাধ্যমে একটি দীর্ঘ পথচলা গড়ে তুলেছেন।
শিক্ষা ও কর্মজীবনের ভিত্তি
ফারিদা ইয়াসমিন এম.এ. ও বি.এড ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। তিনি ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে সমাজের নানা বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে এবং মানুষের জন্য কাজ করার এক গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
আদর্শের টানে রাজনীতিতে
১৯৯২ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হন। পারিবারিকভাবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত হন।
তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতির পথচলা শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে ধানমন্ডি থানার ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি হাজারীবাগ থানার আহ্বায়ক এবং সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ঢাকা জেলা শাখার যুগ্ম কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০১০ সালে ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আন্দোলন–সংগ্রামে সম্মুখসারির নেতৃত্ব
দেশের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে ফারিদা ইয়াসমিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। একজন নারী হয়েও তিনি রাজপথের আন্দোলন, মিছিল ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওয়ার্ড থেকে শুরু করে থানা, জেলা, বিভাগীয় এবং কেন্দ্রীয়—দলের কোনো কর্মসূচিই তিনি বাদ দেননি।
দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তার সাহসী নেতৃত্ব দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। রাজনীতির মাঠে তার এই অবিচল উপস্থিতির কারণে অনেকেই তাকে একজন সংগ্রামী ও সাহসী নারী নেতৃত্ব হিসেবে অভিহিত করেন।
“রাজনীতি আমার কাছে শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব।” — ফারিদা ইয়াসমিন
সাংগঠনিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা
২০১২ সালে তিনি কেরানীগঞ্জ, দোহার ও নবাবগঞ্জ এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পান। তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন এবং ২০২২ সালে কেরানীগঞ্জ জেলা কমিটির সম্মানিত সদস্য নির্বাচিত হন।
নির্বাচনী রাজনীতি ও নেতৃত্বের প্রত্যাশা
তার নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়া–২ (মিরপুর–ভেড়ামারা) সংসদীয় আসন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন।
দলের কঠিন সময়েও তিনি নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে একজন নিবেদিত ও সাহসী নেত্রী হিসেবে তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন।
সর্বশেষ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মিরপুর–ভেড়ামারা থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণী ফোরামের নির্দেশনায় তিনি বর্তমানে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত ত্যাগের মূল্যায়ন করে দল তাকে সংরক্ষিত মহিলা এমপি হিসেবে জাতীয় সংসদে কাজ করার সুযোগ দেবে।
পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ইঞ্জিনিয়ার কে. এম. খালিদুর রহমানের সহধর্মিণী। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে কে. এম. এরফান হানিফ কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পরিবারসহ বসবাস করছেন।
ছোট ছেলে কে. এম. রাশেদ হানিফ যুক্তরাষ্ট্রের রাইট স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিজনেস অ্যানালাইসিস বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং তিনিও পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের আজীবন সদস্য।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ফারিদা ইয়াসমিন নিজেকে একজন সংগ্রামী, আদর্শনিষ্ঠ এবং নিবেদিতপ্রাণ নারী নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে তার এই দীর্ঘ পথচলা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
আপনার মতামত লিখুন :