প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
ঘড়িতে তখন রাত পৌনে বারোটা। নিজের ষষ্ঠ গান শেষ করে সপ্তম গানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেমস। হঠাৎ পেছন থেকে ড্রামার আহসান এলাহি ফান্টিকে ইশারা—একটি শব্দ, ‘বাংলাদেশ’। মুহূর্তেই গায়ে কাঁটা দেওয়া গিটারের ইন্ট্রো। প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে ভেসে আসে—‘তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরীর জলে ভেজায় কবিতায়/আছ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, ভাসানীর শেষ ইচ্ছায়/তুমি বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুনে জ্বলা জ্বালাময়ী সে ভাষণ/তুমি ধানের শিষে মিশে থাকা শহীদ জিয়ার স্বপন’।
দর্শক সারিতে যেন একধরনের প্রশান্তির ঢেউ। দীর্ঘদিন পর মঞ্চে ‘বাংলাদেশ’ গানটি গাইলেন জেমস। গুঞ্জন ছিল, রাজনৈতিক কারণে গানটি গাওয়ার নিষেধাজ্ঞা ছিল।
তবে নগরবাউল বরাবরই বলেছেন, গানটি নিয়ে কোনো বাধা ছিল না; মঞ্চে কোন গান গাইবেন, তা নির্ভর করে সেদিনের ইচ্ছের ওপর।
নিরাপত্তার কারণে কয়েক মাস ধরে বড় কনসার্ট স্থগিত বা বাতিল হওয়ায় সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল একধরনের স্থবিরতা। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের দিন, মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আয়োজন করা হয় বিশেষ কনসার্ট ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
কানায় কানায় ভরা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ—খোলা আকাশের নিচে ফিরে আসে বড় সংগীত উৎসবের আবহ। আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিলেন জেমস ও তাঁর ব্যান্ড নগরবাউল। পাশাপাশি পারফর্ম করেন দিলশাদ নাহার কনা, জেফার রহমান, শিরোনামহীন ও ওয়ারফেজ। উপস্থাপনায় ছিলেন রাফসান সাবাব।
সন্ধ্যা থেকে উত্তাপ ছড়াল মঞ্চে
রাত সাড়ে আটটার দিকে মঞ্চে ওঠে শিরোনামহীন। শুরু থেকেই দর্শকদের সঙ্গে একধরনের আবেগী সংযোগ তৈরি হয়। ‘হাসিমুখ’ গানের প্রথম লাইন উঠতেই হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে। ‘বন্ধ জানালা’ ও ‘আবার হাসিমুখ’–এ আলো জ্বালানো মোবাইল ফোন দুলতে থাকে আকাশের দিকে, যেন খোলা প্রান্তরজুড়ে এক আলোর নদী। ‘এই অবেলায়’ গানের সময় অনেককে দেখা যায় চোখ বন্ধ করে গাইতে—কেউ কাঁধে হাত রেখে দুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার স্রেফ গানের ভেতরে হারিয়ে গেছেন। ব্যান্ডের প্রতিটি কোরাস অংশে দর্শকের সমস্বরে গাওয়া যেন শিল্পী-দর্শকের সীমারেখা মুছে দেয়।
এরপর মঞ্চে আসেন জেফার রহমান। বিয়ের পর একই আয়োজনে জেফার ও উপস্থাপক রাফসান সাবাবকে একসঙ্গে দেখে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল আলাদা। ‘ঝুমকা’ শুরু হতেই সামনের সারি থেকে পেছন পর্যন্ত নাচে ফেটে পড়ে তরুণ দর্শকেরা। কেউ হাততালি দিচ্ছেন তাল মিলিয়ে, কেউ গানের লাইন তুলে নিচ্ছেন জোরে জোরে। জেফারের স্টেজ প্রেজেন্স আর রাফসানের হাস্যরস মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর।
পৌনে দশটার দিকে মঞ্চে ওঠে ওয়ারফেজ। রক ব্যান্ডটির ভারী গিটার রিফ আর শক্তিশালী ড্রাম বিটে যেন মঞ্চের তাপমাত্রাই বদলে যায়। ‘পূর্ণতা’ গানের সময় দর্শকসারি একযোগে কোরাস ধরে, ‘অসামাজিক’–এ উঠে আসে পুরোনো দিনের রক উন্মাদনা। ‘অবাক ভালোবাসা’ ও ‘যতদূরে’–তে অনেকেই হাত তুলে তাল মিলিয়েছেন, মাথা দুলিয়েছেন, কেউ কেউ বন্ধুদের কাঁধে ভর দিয়ে গেয়েছেন গলা ছেড়ে।
এ শিল্পীদের পরিবেশনায় সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত দর্শকের সাড়া ছিল চোখে পড়ার মতো—কণ্ঠ মিলিয়েছে, নেচেছে, গেয়েছে। খোলা আকাশের নিচে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন হয়ে উঠেছিল এক বিশাল কনসার্ট অ্যারিনা, যেখানে শিল্পী আর শ্রোতা মিলেমিশে তৈরি করেছেন এক মনে রাখার মতো মুহূর্ত।
রাত ১১টায় জেমস, আর তারপর..
রাত ১১টায় মঞ্চে ওঠেন জেমস। শুরু করেন ‘কবিতা, তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না’ দিয়ে। এরপর একে একে শোনান ‘দিওয়ানা মাস্তানা’, ‘গুরু ঘর বানাইলা কি দিয়া’, ‘মা’, ‘দুষ্ট ছেলের দল’, ‘পাগলা হাওয়া’সহ তাঁর জনপ্রিয় গানগুলো। গানের ফাঁকে ফাঁকে ভক্তদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা আমার জান, তোমরাই আমার প্রাণ, তোমরা যত দিন আছ, আমি আছি।’ কখনো কৃতজ্ঞতা জানান, কখনো চুম্বন ছুড়ে দেন দর্শকের দিকে। ভক্তদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো। কয়েকবার দর্শক সারি থেকে ছুটে এসে জেমসকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করেন কেউ কেউ; নিরাপত্তাকর্মীদের সামলাতে হয় বাড়তি চাপ।
পুরো পরিবেশনায় জেমসকে কিছুটা অসুস্থ মনে হয়েছে। বারবার পেছনে গরম পানিতে আদা খেতে দেখা যায় তাঁকে। কাশির জন্য কয়েকবার বিরতিও নেন। তবু থামেননি—ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন। রাত ঠিক বারোটায় ‘আসবার কালে আসলাম একা’ দিয়ে শেষ হয় তাঁর পারফরম্যান্স। একই সঙ্গে শেষ হয় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টের আয়োজন।
দীর্ঘ স্থবিরতার পর খোলা আকাশের নিচে হাজারো কণ্ঠের একসঙ্গে গাওয়া গান—সেই রাত যেন শুধু একটি কনসার্ট নয়, ছিল ফিরে পাওয়ার এক সম্মিলিত অনুভূতি।
আপনার মতামত লিখুন :