ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২
amaderkhobor24.com

দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে তিনি আজ আমাদের মহানায়ক

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১০:০১ এএম

দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে তিনি আজ আমাদের মহানায়ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন এবং সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে গণতন্ত্রকামী মানুষের জনরায়ের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ—এটি নিছক রাজনৈতিক পালাবদল নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। ইতিহাসের এমন সন্ধিক্ষণে নেতৃত্ব শুধু ক্ষমতার প্রতীক নয়, বরং আস্থা, প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতার সমন্বিত রূপ। আজকের বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে আশা ও চ্যালেঞ্জ পাশাপাশি পথ চলেছে।

নির্বাসন শেষে প্রত্যাবর্তন সবসময়ই আবেগময়; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতার কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। জনরায়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নেতৃত্বের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। এই প্রত্যাশা কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নয়—এটি ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বস্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সম্মিলিত দাবি। ফলে সরকারের প্রথম কাজ হবে জনআস্থার ভিত্তি দৃঢ় করা, যাতে মানুষ অনুভব করে—রাষ্ট্র তাদের জন্য কাজ করছে।

নতুন ও পুরোনো নেতৃত্বের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠন একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। অভিজ্ঞতা যেমন স্থিতি দেয়, তেমনি নতুন প্রজন্ম আনে গতি ও উদ্ভাবন। তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়। দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও নীতিগত সততা নিশ্চিত করা গেলে একটি কার্যকর মন্ত্রিপরিষদ রাষ্ট্রযন্ত্রকে গতিশীল করতে পারে। অন্যথায় সমন্বয়হীনতা নীতি বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা কেবল পরিসংখ্যান নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আর্থিক দায়ের প্রতীক। রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করা, অপচয় রোধ, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যপূর্ণ পুনর্গঠন—এসব এখন সময়ের দাবি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তব রূপ পায় না।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতা আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা না গেলে উন্নয়নের যে কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় নিয়ামক।

দেশি-বিদেশি চাপ ও কূটনৈতিক সমীকরণও বর্তমান বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কূটনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস।
দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা করাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিপুল জনসমর্থন যেমন শক্তি, তেমনি সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তা অস্থিরতার কারণ হতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা, দায়িত্বের সুষম বণ্টন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

সবশেষে, রাষ্ট্র পরিচালনার আসল পরীক্ষা দায়িত্বশীলতায়। দুর্নীতি দমন, জনসেবার মানোন্নয়ন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা—এই তিনটি স্তম্ভই জনআস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে সমঝোতা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র লাভবান হবে।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রা যেমন প্রতীকী, তেমনি বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় পূর্ণ। সামনে পথ সহজ নয়—কিন্তু সুসংহত নেতৃত্ব, নীতিগত দৃঢ়তা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে চ্যালেঞ্জই হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। রাষ্ট্রের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, সংযম ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত—যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ পথ নির্মাণ করবে।

লেখক: খালিদ সাইফুল্লাহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Link copied!