ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২
amaderkhobor24.com

বিয়ের কনে মানেই লাল—কেন এত জনপ্রিয় এই রঙ

আমাদের খবর ২৪

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম

বিয়ের কনে মানেই লাল—কেন এত জনপ্রিয় এই রঙ

বিয়ের আয়োজন শুরু হলেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় কনের পোশাক নিয়ে। শাড়ি কেমন হবে, গয়না কেমন হবে, সাজ কেমন হবে—সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকে নববধূ। কিন্তু প্রায় সব আয়োজনের শেষে এসে দেখা যায়, অধিকাংশ কনের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে একটি রঙ—লাল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি বিয়ের সঙ্গে এই রঙ এতটাই জড়িয়ে গেছে যে অনেক সময় লাল ছাড়া কনের সাজ কল্পনা করাই কঠিন মনে হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বিয়ের ছবি, সিনেমা, নাটক কিংবা পারিবারিক অ্যালবাম—সব জায়গাতেই লাল শাড়ি পরা কনের উপস্থিতি চোখে পড়ে। লাল বেনারসি, লাল জামদানি বা লাল লেহেঙ্গা যেন বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এই পছন্দ শুধু সৌন্দর্যের কারণে নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ধারণা এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। সময়ের সঙ্গে ফ্যাশনে পরিবর্তন এলেও এই রঙের গুরুত্ব এখনো কমেনি।

লালের সঙ্গে শুভতার সম্পর্ক
দেবীরা নাকি লাল বস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মর্ত্যের মানুষকে রক্ষা করতেন এমন বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রোথিত এই রঙ প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ। এজন্য দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতিতে লাল রঙকে শুভ ও মঙ্গলজনক হিসেবে দেখা হয়। বিয়ের মতো নতুন জীবনের সূচনায় তাই এই রঙকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেকের বিশ্বাস, লাল ভালোবাসা, শক্তি, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক। নতুন দাম্পত্য জীবনে সুখ, স্থিতি ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাঙালি সমাজে বিবাহ শুধু দুই মানুষের সম্পর্ক নয়, এটি দুই পরিবার ও দুই সামাজিক পরিসরের বন্ধন। তাই বিয়ের পোশাকেও সেই উৎসবের আবহ ফুটে ওঠে। লাল রঙের উজ্জ্বলতা এই আনন্দের প্রতীক হিসেবেই ধরা হয়।

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
এশীয় বিয়ের ইতিহাসে লাল শাড়ির উপস্থিতি বহু পুরোনো। মুঘল আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বেনারসি শাড়ি কনের প্রধান পোশাক হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়। পরিবারের বড়দের কাছ থেকেও অনেক সময় এই ঐতিহ্য অনুসরণের প্রত্যাশা থাকে।

ফলে অনেক কনে নিজের পছন্দের পাশাপাশি পরিবারের ইচ্ছাকেও গুরুত্ব দেন। অনেকে মনে করেন, লাল শাড়ি পরলে বিয়ের পূর্ণতা আসে। তাই আধুনিক ফ্যাশনের নানা বিকল্প থাকলেও এই রঙের জনপ্রিয়তা এখনো অটুট।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
রঙের মনস্তত্ত্বেও লালের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি এমন একটি রঙ যা সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি তৈরি করে। বিয়ের অনুষ্ঠানে যেখানে কনে পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে লাল পোশাক তাকে আলাদা করে তুলে ধরে।

অনেক ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিয়ের দিনের আবেগ, উত্তেজনা ও আনন্দের সঙ্গে লাল রঙের একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। তাই কনের সাজে এই রঙ ব্যবহার করলে অনুষ্ঠানের আবহ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে পছন্দ
তবে সময়ের সঙ্গে বিয়ের ফ্যাশনেও পরিবর্তন আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ড এবং ডিজাইনারদের নতুন ভাবনার কারণে এখন অনেক কনে ভিন্ন রঙও বেছে নিচ্ছেন। প্যাস্টেল, গোলাপি, অফ-হোয়াইট বা সবুজ রঙের পোশাকও দেখা যাচ্ছে অনেক বিয়েতে।

বিশেষ করে প্রি-ওয়েডিং বা রিসেপশনের মতো অনুষ্ঠানে রঙের বৈচিত্র্য বাড়ছে। তবুও মূল বিয়ের অনুষ্ঠানে লাল এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় রঙগুলোর একটি।

বর্তমান সময়ে অনেক ডিজাইনার লাল রঙের মধ্যেই নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন। কখনো গাঢ় মেরুন, কখনো রক্তিম লাল, আবার কখনো লালের সঙ্গে সোনালি বা সবুজের মিশ্রণ—এই সব নকশা ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই নতুন রূপ তৈরি করছে।

শেষ পর্যন্ত অনেক কনের কাছে লাল পোশাক শুধু একটি সাজ নয় বরং জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্তের প্রতীক। বিশেষ দিনে ‘কবুল’ বলার জন্য ভালোবাসা, আবেগ আর প্রাণশক্তির প্রতীক এই রঙকেই সচরাচর মানুষ বেছে নেয়।

Link copied!