প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ১২:০৬ এএম
ভ্রমণ মানেই শুধু প্রকৃতি দেখা নয়। কখনো কখনো সময়ের ভেতর ফিরে যাওয়াও এক ধরনের ভ্রমণ। ইতিহাসপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জমিদার বাড়িগুলো ঠিক তেমনই এক দরজা। যেখান দিয়ে ঢুকলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক সময়ের রাজকীয় জীবন, সামাজিক কাঠামো, শাসনব্যবস্থা আর শিল্প-সংস্কৃতির গল্প।
বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এসব জমিদার বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। সংরক্ষণের অভাবে অনেকগুলো জীর্ণ হলেও ইতিহাস আর স্থাপত্যের সৌন্দর্যে এগুলো এখনো অনন্য। সুযোগ পেলেই ঘুরে আসতে পারেন এমন পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি।
হরিপুর জমিদার বাড়ি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত হরিপুর জমিদার বাড়ি তিতাস নদীর পূর্ব তীরে নির্মিত এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। প্রায় ১৭৫ বছর আগে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে জমিদার গৌরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরী এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই ত্রিতলবিশিষ্ট জমিদার বাড়িতে রয়েছে প্রায় ৬০টি কক্ষ। দরবার হল, নাট্যশালা, রন্ধনশালা, গোশালা, গুদামঘর, শয়নকক্ষ, মন্দির, মঠ ও পুকুরসহ নানা স্থাপনা ছিল এখানকার নিয়মিত জীবনযাত্রার অংশ।
বাড়িটির পশ্চিম পাশে রয়েছে সান বাঁধানো ঘাট। যা সরাসরি তিতাস নদীতে নেমে গেছে। একসময় নৌপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। তাই নদীমুখী ঘাটকেই করা হয়েছিল প্রধান প্রবেশপথ।
বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে পড়লে এর সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’–র শুটিং হয়েছিল এই জমিদার বাড়িতেই।
দুঃখজনক হলেও সত্য। আজ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এখনো সেখানে জমিদার পরিবারের পুরোহিতদের বংশধররা বসবাস করছেন।
তেওতা জমিদার বাড়ি
মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে অবস্থিত তেওতা জমিদার বাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়। এটি বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রেমজীবনের স্মৃতিচিহ্ন বহন করে এই প্রাসাদ।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭শ শতকে জমিদার পঞ্চানন সেন এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন। একসময় দরিদ্র জীবন কাটানো পঞ্চানন সেন দিনাজপুর অঞ্চলে তামাক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন এবং পরবর্তীতে এই প্রাসাদ গড়ে তোলেন। পরে জয়শংকর ও হেমশংকর নামে দুই ব্যক্তি এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় ৭.৩৮ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই জমিদার বাড়ি চত্বরে রয়েছে লালদিঘী নামের মূল প্রাসাদ, নটমন্দির, নবরত্ন মঠসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা। সব মিলিয়ে এখানে প্রায় ৫৫টি কক্ষ রয়েছে।
ভারত বিভক্তির পর জমিদার পরিবারের সদস্যরা ভারত চলে গেলে প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দখলের কারণে বর্তমানে বাড়িটির বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তবু ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ইতিহাসের গন্ধ এখনো টের পাওয়া যায়।
নাগরপুর জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় অবস্থিত নাগরপুর জমিদার বাড়ি চৌধুরী বংশের জমিদারি ঐতিহ্যের প্রতীক। জমিদার সুবিদ্ধা খাঁ-এর হাত ধরে নাগরপুরে এই বংশের জমিদারি শুরু হয়। প্রথম জমিদার যদুনাথ চৌধুরী প্রায় ৫৪ একর জমিতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।
এই জমিদার বাড়ির সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর শাসনামল। তিনি কলকাতার আদলে নাগরপুরকে সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। জমিদার বাড়ির পাশে ছিল রঙ্গমহল ও সুদৃশ্য চিড়িয়াখানা। যেখানে ময়ূর, কাকাতোয়া, হরিণ ও নানা পাখি রাখা হতো।
ঝুলন দালান ছিল এ বাড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানেই পূজা-পার্বণ, নাটক, যাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো। শ্রাবণ মাসের জ্যোৎস্না রাতে এই বাড়ি উৎসবমুখর হয়ে উঠত।
বর্তমানে জমিদার বাড়ির মূল ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নাগরপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ। ফলে ঐতিহ্য আর আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য মেলবন্ধন এখানে দেখা যায়।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বা বালিয়াটি প্রাসাদ বাংলাদেশের সবচেয়ে সংরক্ষিত ও জনপ্রিয় জমিদার বাড়িগুলোর একটি। মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত এই প্রাসাদ উনিশ শতকে নির্মিত।
প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৪ বর্গমিটার জমির ওপর বিস্তৃত এই প্রাসাদ চত্বরটি সাতটি দক্ষিণমুখী দালানের সমন্বয়ে গঠিত। প্রাসাদের অন্দরমহলে বসবাস করতেন জমিদার পরিবারের নারী সদস্যরা।
গোবিন্দ রাম সাহা এই জমিদার পরিবারের গোড়াপত্তন করেন। তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ও হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
প্রাসাদের চারপাশে উঁচু দেয়াল, তিনটি প্রবেশপথ ও সিংহখোদাই করা তোরণ রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ভবনটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি সংরক্ষণ করছে।
মহেরা জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় অবস্থিত মহেরা জমিদার বাড়ি সৌন্দর্য, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। ১৮৯০ সালের আগে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে এটি নির্মিত হয়।
প্রবেশপথে বিশাল বিশাখা সাগর দীঘি, ভেতরে পসরা পুকুর ও রানি পুকুর, ফুলের বাগান ও আম্রকানন। সব মিলিয়ে প্রাসাদটি অত্যন্ত মনোরম।
১৯৭১ সালে পাকবাহিনী এখানে হামলা চালিয়ে জমিদার বাড়ির কুলবধূসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। পরে এখানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপিত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এটি পুলিশ ট্রেনিং স্কুল এবং ১৯৯০ সালে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত হয়। বর্তমানে এটি একটি সুশৃঙ্খল ও সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনা।
জমিদার বাড়িগুলো আমাদের ইতিহাসের নীরব দলিল। এগুলো শুধু অতীতের রাজকীয় জীবনের স্মারক নয়। বরং সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার সাক্ষ্য। সংরক্ষণ আর সচেতন ভ্রমণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যগুলো বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব। সময় পেলেই ইতিহাসের এই রাজপথে হাঁটুন। দেখবেন ইট-পাথরও কথা বলে।
আপনার মতামত লিখুন :